চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে ১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই একটি অবিস্মরণীয় তারিখ। ঠিক রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে ইংল্যান্ডের ওল্ডহ্যাম জেনারেল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম নেয় লুইস জয় ব্রাউন। এই শিশুটিই বিশ্বের প্রথম ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া সন্তান। তার জন্মের পর থেকেই 'টেস্টটিউব বেবি' নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায় লুইস।
তবে প্রকৃতপক্ষে নিষিক্তকরণের জন্য টেস্টটিউব নয়, বরং পেট্রিডিশ নামক ল্যাবরেটরি পাত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটানো হয় সেই পাত্রে এবং পরে ভ্রূণটি মায়ের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। এই পদ্ধতি উদ্ভাবন ও সফল প্রয়োগের পেছনে ছিলেন তিনজন বিজ্ঞানী—গাইনোকোলজিস্ট প্যাট্রিক স্টেপটো, ফিজিওলজিস্ট রবার্ট এডওয়ার্ডস এবং নার্স ও ভ্রূণতত্ত্ববিদ জিন পারডি। তারা ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে শতাধিকবার আইভিএফ পদ্ধতিতে ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হন।
এর আগে, লুইসের বাবা-মা জন ও লেসলি ব্রাউন দশ বছর ধরে নিঃসন্তান ছিলেন। ব্রিস্টলের এই দম্পতি সম্ভাব্য সব চিকিৎসা করিয়েও সন্তান না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন। ১৯৭৭ সালের নভেম্বরে লেসলি জানতে পারেন তার ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক থাকায় স্বাভাবিকভাবে মা হওয়া সম্ভব নয়। অবশেষে ব্রিস্টলের এক চিকিৎসক তাকে ওল্ডহ্যামের একটি ক্লিনিকে পাঠান, যেখানে স্টেপটো, এডওয়ার্ডস ও পারডি গবেষণা করছিলেন।
১৯৭৭ সালের বড়দিনের আগে লেসলি ব্রাউন প্রফেসর এডওয়ার্ডসের কাছ থেকে একটি চিঠি পান। চিঠিতে লেখা ছিল যে তার রক্ত ও ইউরিন পরীক্ষায় প্রাথমিক গর্ভাবস্থার ইঙ্গিত মিলেছে। তাকে পাহাড়ে ওঠা, স্কিইং বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। লেসলি আজীবন সেই চিঠিটি রেখেছিলেন।
লুইসের জন্মের খবর মিডিয়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। ওল্ডহ্যাম হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকদের তাঁবু পড়ে যায়। জন্মের আগেই লুইস সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেক ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠী একে 'খোদার ওপর খোদকারি' বলে আখ্যা দেয়। কেউ কেউ লুইসকে 'ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের শিশু' বলেও ডাকে। ভ্যাটিকানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ এটিকে মানবশিশুর জন্ম প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানের অযাচিত হস্তক্ষেপ বলে নিন্দা জানায়।
তবে লুইসের সুস্থ ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা প্রমাণ করে যে আইভিএফ পদ্ধতি নিরাপদ। তার জন্মের পর গবেষকরা অনাগত শিশুটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ড. স্টেপটো লেসলিকে নিজের গাড়িতে করে লুকিয়ে রাখেন এবং সিজারিয়ানের আগ পর্যন্ত সাংবাদিকদের থেকে দূরে রাখেন।
জন্মের পর 'বেবি লুইস' রাতারাতি মিডিয়া সেনসেশনে পরিণত হন এবং বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করেন। তার এই ভ্রমণ বিশ্বের অসংখ্য নিঃসন্তান দম্পতিকে নতুন করে আশা জোগায়। বর্তমানে লুইস ব্রাউন তার স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করছেন। তার দুই পুত্র স্বাভাবিক পদ্ধতিতে জন্মেছে, যা আইভিএফ পদ্ধতির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রমাণ করে।
লুইস এখন বোর্ন হল আইভিএফ ক্লিনিকে অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছেন। এই ক্লিনিকটি ড. স্টেপটো, ড. এডওয়ার্ডস ও জিন পারডি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন সেমিনারে আইভিএফ পদ্ধতি নিয়ে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন।
দুঃখজনকভাবে, নোবেল কমিটি এই তিন অগ্রদূতের অবদান দেরিতে স্বীকৃতি দেয়। ২০১০ সালে শুধু রবার্ট এডওয়ার্ডস চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। ড. স্টেপটো ১৯৮৮ সালে এবং জিন পারডি ১৯৮৫ সালে মারা যাওয়ায় তাদের নোবেলের জন্য বিবেচনা করা হয়নি, কারণ মরণোত্তর নোবেল দেওয়া হয় না।
লুইস ব্রাউন ২০১৫ সালে 'মাই লাইফ অ্যাজ দ্য ওয়ার্ল্ডস ফার্স্ট টেস্টটিউব বেবি' নামে আত্মজীবনী প্রকাশ করেন। তার জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে ২০২৪ সালে নেটফ্লিক্সে 'জয়' নামে একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়।
লুইসের জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি শিশু আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্মেছে। বাংলাদেশেও এই পদ্ধতি এখন অত্যন্ত পরিচিত, সহজলভ্য ও নিরাপদ। বন্ধ্যাত্বের অপবাদে সংকুচিত থাকা অসংখ্য নিঃসন্তান দম্পতির মুখে হাসি ফুটিয়েছে আইভিএফ।
লুইসের জন্মের রাতেই ড. স্টেপটো তার নাম রেখেছিলেন 'জয়' বা আনন্দ। এই আনন্দ যেন আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুর হাসিমুখের প্রতিচ্ছবি। মানুষের জিনের অজানা রহস্য উন্মোচন এবং বিভিন্ন রোগের সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও আইভিএফ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হয়।




