বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এআই যাতে ব্যবহারকারীদের নিরাপদে ও কার্যকরভাবে সহায়তা করতে পারে, সেটি নির্ভর করে একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর, যা ‘হার্নেস ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামে পরিচিত। এই প্রকৌশল শাখাটি জেনারেটিভ এআই এবং বড় ভাষার মডেল (এলএলএম) ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সিস্টেম স্ক্যাফোল্ডিং ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে। বিশেষত মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে হার্নেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এটি নির্ধারণ করে দেয় একটি এআই সিস্টেম কতটা ভালো বা খারাপভাবে ব্যবহারকারীর মানসিক অবস্থার প্রতি সাড়া দিতে পারে।
হার্নেস ইঞ্জিনিয়ারিংকে সহজভাবে বোঝানো যায় একটি ঘোড়ার জিন বা লগামের মতো। যেমন ঘোড়াকে কাজে লাগাতে জিনের প্রয়োজন, তেমনি এআই মডেলকে ব্যবহারযোগ্য করতে প্রয়োজন উপযুক্ত ‘হার্নেস’। এই হার্নেসের মধ্যে রয়েছে সিস্টেম প্রম্পট, টুল ইন্টিগ্রেশন, রিট্রিভাল সিস্টেম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মানব তদারকি—এগুলো সব মিলিয়ে একটি স্তরবিন্যাস তৈরি করে। অর্কেস্ট্রেশন লেয়ার নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর এআইয়ের কার্যপ্রবাহকে সুসংহত করে: ব্যবহারকারীর প্রম্পট টোকেনাইজ করা, প্রক্রিয়াকরণের সময় বাহ্যিক অ্যাপ বা সিস্টেমে সংযোগ স্থাপন, এবং শেষে সঠিক প্রতিক্রিয়া প্রদান—সবকিছুই এই স্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে হার্নেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে: সিস্টেম প্রম্পট, টুল ইন্টিগ্রেশন, রিট্রিভাল সিস্টেম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মানব থেরাপিস্টের সাথে সংযোগ।
প্রথমত, সিস্টেম প্রম্পট হলো এআইয়ের জন্য উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা। এআই নির্মাতারা এই প্রম্পটে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নির্দেশনা যুক্ত করেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যবহারকারী যদি মানসিক সংকটে থাকেন বলে এআই শনাক্ত করে, তাহলে প্রম্পটটি নির্দেশ দিতে পারে যে এআই সরাসরি একটি হটলাইনে সংযোগ স্থাপন করবে। অ্যানথ্রপিক ক্লডের মতো কিছু এআইয়ের সিস্টেম প্রম্পটে এই ধরনের নির্দেশনা বিদ্যমান, যা নিয়মিত পরিমার্জিত হয়। তবে শুধু নির্দেশনা থাকলেই চলবে না; চলাকালীন সময়ে এআই যেন সেই নির্দেশনা অনুসরণ করে, সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি।
দ্বিতীয়ত, টুল ইন্টিগ্রেশন বা বাহ্যিক সরঞ্জামের সংযুক্তি। সাধারণ উদ্দেশ্যের এআই (জিপিএআই) মানসিক স্বাস্থ্য জটিলতা সামাল দিতে পারে না, তাই এটি বিশেষায়িত এআই (পিবিএআই)-এর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারে। এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া হার্নেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। যদি হার্নেস দুর্বল হয়, তাহলে সংযোগ বিলম্বিত বা ব্যর্থ হতে পারে, যা ব্যবহারকারীকে বিপদে ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, রিট্রিভাল সিস্টেম। মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের সময় এআই প্রায়ই ডিএসএম-৫ বা সাম্প্রতিক গবেষণার মতো তথ্য আহরণ করে। হার্নেস ইঞ্জিনিয়ারিং যদি সঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে ভুল বা বিকৃত তথ্য ফিরে আসতে পারে, যা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
চতুর্থত, নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অনেক এআই নির্মাতা ফোনভিত্তিক হটলাইনের সংযোগ যুক্ত করেন। ব্যবহারকারী যখন এআই চ্যাটে মানসিক সমস্যা প্রকাশ করেন, তখন এআই তাকে ৯৮৮-এর মতো নম্বরে কল করার পরামর্শ দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এআই সরাসরি হটলাইনের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। এই সংযোগটি মসৃণভাবে কাজ করে কি না, তা নির্ভর করে হার্নেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর।
পঞ্চমত, মানব থেরাপিস্টের সাথে রিয়েল-টাইম সংযোগ। ওপেনএআই সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে তারা মানব থেরাপিস্টদের একটি ডাটাবেস তৈরি করছে, যাতে এআই শনাক্ত করলে ব্যবহারকারী সরাসরি একজন থেরাপিস্টের সাথে কথা বলতে পারেন। এটি জরুরি অবস্থার বাইরেও ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। হার্নেস ইঞ্জিনিয়ারিং এই ধরনের সংযোগ সহজতর করে।
সমালোচকরা মনে করেন এআইয়ের মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া উচিত নয়, এবং কিছু আইনপ্রণেতা এটি নিষিদ্ধ করতে চান। কিন্তু প্রতিদিন কয়েক কোটি মানুষ এআই ব্যবহার করছে মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য। এই পরিস্থিতিতে সঠিক হার্নেস ইঞ্জিনিয়ারিং নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি—এটি এআইকে উপকারী ও নিরাপদ করতে পারে, অথবা বিপরীতভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক হ্যারি এমারসন ফসডিক বলেছিলেন, ‘ঘোড়া যতক্ষণ না জিনবন্দী হয়, ততক্ষণ সে কোথাও যায় না।’ এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ব্যবহারকারীদের নিশ্চিত হওয়া উচিত যে তারা যে এআই ব্যবহার করছেন, সেটি সঠিকভাবে ‘হার্নেসড’ হয়েছে। কোনো বুনো ঘোড়া যেন এআইয়ের নামে না চলে।




