মানবসভ্যতার পাঠানো অন্যতম সফল মহাকাশযান নিউ হরাইজন্স আবারও জেগে উঠেছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৯০ কোটি মাইল (৯৫০ কোটি কিলোমিটার) দূরে সৌরজগতের এক বরফশীতল ও অন্ধকার প্রান্তে অবস্থান করা এই যানটি দীর্ঘ ১০ মাসের পরিকল্পিত শীতনিদ্রা শেষে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এসেছে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট থেকে এটি হাইবারনেশন মোডে ছিল, যেখানে খুব কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে নিরাপদে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। গত ২৩ জুন একটি স্বয়ংক্রিয় সংকেতের মাধ্যমে মূল কম্পিউটার পুনরায় চালু হয় এবং এখন সব যন্ত্রপাতি ঠিকমতো কাজ করছে বলে জানিয়েছে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লায়েড ফিজিকস ল্যাবরেটরি, যা এই মিশন পরিচালনা করছে।
বর্তমানে নিউ হরাইজন্স কুইপার বেল্টে অবস্থান করছে। নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি হাজার হাজার বরফ, পাথর ও জমাট গ্যাসের মহাজাগতিক বস্তুতে ভরা, যাদের ট্রান্স-নেপচুনিয়ান অবজেক্ট (টিএনও) বলা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে সৌরজগৎ গঠনের সময় অবশিষ্ট উপাদান থেকেই এগুলো তৈরি হয়েছে, তাই কুইপার বেল্টকে সৌরজগতের প্রাচীন ইতিহাসের ভান্ডার হিসেবে দেখা হয়।
নিউ হরাইজন্সের সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০১৫ সালে, যখন এটি ইতিহাসের প্রথম মহাকাশযান হিসেবে প্লুটো ও তার পাঁচটি উপগ্রহের কাছ দিয়ে উড়ে যায়। সেই অভিযান থেকে পাওয়া ছবি ও তথ্য প্রমাণ করে যে প্লুটো কেবল বরফের পিণ্ড নয়—সেখানে রয়েছে বরফের সমভূমি, সুউচ্চ পাহাড়, পাতলা বায়ুমণ্ডল ও সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। এরপর ২০১৯ সালে এটি অ্যারোকথ নামের তুষারমানবের মতো আকৃতির একটি প্রাচীন বস্তুর কাছ দিয়ে যায়, যা সৌরজগৎ সৃষ্টির পর প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। সেই পর্যবেক্ষণ গ্রহ তৈরির প্রাথমিক ধাপ সম্পর্কে নতুন ধারণা দেয়।
এখন নিউ হরাইজন্স কুইপার বেল্টের আরও গভীরে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি সেখানে থাকা বরফময় বস্তুগুলোর ঘূর্ণনের গতি, দিক ও আকৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রকল্পের বিজ্ঞানী পন্টাস ব্র্যান্ড জানিয়েছেন, অ্যারোকথের মতো জোড়া আকৃতির বস্তু ধারণার চেয়ে বেশি থাকতে পারে, যা ইঙ্গিত দেয় যে পৃথিবীসহ বড় গ্রহগুলো হয়তো এভাবেই গঠিত হয়েছিল। একই সঙ্গে নিউ হরাইজন্স সূর্যের প্রতিরক্ষাবলয় হেলিওস্ফিয়ার সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করছে। এতে থাকা পেপসি (PEPSSI) যন্ত্রটি মহাজাগতিক রশ্মি বা কসমিক রে পরিমাপ করছে, যা ভবিষ্যতের মহাকাশচারীদের জন্য হুমকি হতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, হেলিওস্ফিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষতিকর রশ্মি প্রতিহত করে।
তবে মহাকাশযানটির তথ্য বিজ্ঞানীদের নতুন ধাঁধায় ফেলেছে। আগে ধারণা ছিল কুইপার বেল্টের বাইরে ধূলিকণার পরিমাণ দ্রুত কমে যাবে, কিন্তু নিউ হরাইজন্স দেখাচ্ছে সেখানে ধূলিকণার ঘনত্ব বেশ বেশি। এর অর্থ কুইপার বেল্ট আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। ২০২৬ সালের আগস্টে উৎক্ষেপণ হতে যাওয়া ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ এই রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শীতনিদ্রা নিউ হরাইজন্সের অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে যাত্রা শুরুর পর থেকে এটি মাঝেমধ্যেই শীতনিদ্রায় যায়। এ সময় কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলো তথ্য সংগ্রহ চালিয়ে যায় এবং পরে তা পৃথিবীতে পাঠানো হয়। নাসার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নিউ হরাইজন্স ২০ বারের বেশি শীতনিদ্রায় গেছে। বর্তমানে এটি দ্বিতীয় বর্ধিত মিশনে রয়েছে, যা ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার কথা। তবে যদি যানটি ভালো থাকে এবং মূল্যবান তথ্য পাঠাতে থাকে, তবে মিশনের মেয়াদ আরও বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে এটি ভয়েজার মহাকাশযানের পথ অনুসরণ করে হেলিওস্ফিয়ারের বাইরে ইন্টারস্টেলার স্পেসে পৌঁছে যেতে পারে, যেখানে এখন পর্যন্ত হাতে গোনা কয়েকটি মহাকাশযানই পৌঁছাতে পেরেছে।




