বাংলার মৃৎশিল্পের প্রধান উপাদান কাদামাটি। আদর্শ মাটি শুধু নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক অঞ্চলে পাওয়া যায়, যার ফলে তৈরি হয় অনন্য স্থানীয় পণ্য। যেমন, মটকির জন্য ফতেহপুর, খেলনার জন্য বিক্রমপুর ও রাজবাড়ী, আর হাঁড়ি-কুড়ির জন্য বিখ্যাত বরিশাল ও নড়াইল। শুধু সাজসজ্জা নয়, একসময় দৈনন্দিন ব্যবহারেও এই সব পণ্যের ব্যাপক প্রচলন ছিল। ধারণা করা হয়, মাটির পাত্র স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি প্রচুর আর্দ্রতা সরবরাহ করে এবং প্রাকৃতিকভাবে ক্ষার শোষণ করে শরীরের অম্লতা বা অ্যাসিডিটি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। তাই মাটির পাত্রে রাখা পানি ও খাবার অ্যাসিডিটি নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে বলে মনে করা হয়।
ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, 'মাটি' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'মৃত্তিকা' থেকে। যারা ঘুরন্ত চাকার ওপর এঁটেল মাটির তাল দিয়ে বাসনকোসন তৈরি করেন, তাদের 'কুমোর', 'কুমহার' বা 'কুমার' বলা হয়, যা সংস্কৃত 'কুম্ভকার' শব্দ থেকে এসেছে। যুগ যুগ ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নিপুণ হাতের কারুকাজে মাটি দিয়ে নানা তৈজসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু আধুনিকতার প্রভাবে ধীরে ধীরে তাদের জীবিকার এই জায়গাটি সংকুচিত হয়ে আসছে। নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাটির পণ্যের জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিক ও সিনথেটিকের সামগ্রী।
তবে মাটির সব জিনিস যে হারিয়ে গেছে তা নয়। গ্রামাঞ্চলে এখনো রুটি সেঁকতে খোলা, পানি রাখতে কুজো, শুরাই, মটকি, কোলাকলসি ও ঘটের প্রচলন রয়েছে। ভাত রান্নার জন্য হাঁড়ি, তরকারির জন্য কড়াই বা বাগি, ভাতের মাড় গালাতে আউত্তা, সবজি রাখার জন্য খোরা এবং খাওয়ার প্লেট হিসেবে বাসন বা সানকির ব্যবহার এখনো চোখে পড়ে। অন্যদিকে শহরে মাটির পট-পটারি, ফুলদানি, টব ও বাহারি হাঁড়ির কদর রয়েছে ঘর সাজানোর কাজে।
বিশেষ কিছু কাজেও মাটির পাত্র অপরিহার্য। আখের গুড় ও চ্যাপাশুঁটকি সংরক্ষণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় জাইল্লা বা জালা। একসময় গরুর খাবার পরিবেশনের কাজে চাড়ির ব্যবহার ছিল, যা এখন শুধু দেশের পশ্চিমাঞ্চলেই বেশি দেখা যায়। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ, বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা সমুদ্র বা বনে যাওয়ার সময় নৌকায় পানীয় জলের জন্য মাটির কোলা ব্যবহার করেন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণেও উপকূলীয় এলাকায় জাইল্লা-মটকি ব্যবহার করা হয়। সুন্দরবন সংলগ্ন কালীগঞ্জের ফতেহপুর বাঁশবাড়ি পালবাড়িতে এখনো জাইল্লা ও মটকি তৈরি হয়।
দেশের প্রায় সব জেলাতেই মাটির পণ্য তৈরি হয়, শুধু পাহাড়ের রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় উৎপাদন না হলেও খাগড়াছড়ি ও চকোরিয়ার কুমারেরা সেখানে সরবরাহ করেন। খাগড়াছড়িতে মুসলমানেরা মাটির পাত্র তৈরি করেন, যা একটি ব্যতিক্রমী দিক। সেখানে তৈরি কলস পাহাড়ের জুমঘরে ব্যবহৃত হয়, যেখানে পথিকের বিশ্রাম ও পানের পানির ব্যবস্থা থাকে। পাশে রাখা বদনাটি স্থানীয়রা 'ওখক-কাড়া' নামে চেনেন। সনাতন ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানে ঘটের ব্যবহার আবশ্যকীয় হওয়ায় প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই মৃৎপাত্র পাওয়া যায়। ধর্মীয় কারণে প্রতিমাশিল্পী এবং মহাদেবের তুষ্টির জন্য কলকির কদরও সারাদেশে রয়েছে।
অঞ্চলভেদে মৃৎশিল্পের বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। পঞ্চগড়ে সাধারণত পানি রাখার কলস, ভাতের হাঁড়ি, রুটির তাওয়া ও তরকারি রান্নার কড়াই বেশি ব্যবহৃত হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘরিয়া কুমারবাড়ি এবং রাজশাহীর প্রেমতলী পালবাড়িতে তৈরি লম্বা মুখের কলস 'শুরাই' পানি ঠান্ডা রাখার জন্য বিখ্যাত। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা টেপাপুতুলের জন্য বিখ্যাত। ঝালকাঠির শিমুলেশ্বর পালবাড়ি, জুড়ি, বড়লেখা, বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ, ঝিনাইদহ ও রাজবাড়ীতে মনসার ঘট তৈরি হয়। বিক্রমপুরের বাসাইলের ভেঙ্গু পালের বাাড়ি লক্ষ্মীপূজার লক্ষ্মীসরার জন্য বিখ্যাত। ভাত রান্নার হাঁড়ির জন্য নড়াইল বিখ্যাত, যার দিঘলিয়া অথবা কুরুলিয়ার হাঁড়ি যায় মৃৎশিল্পের গুরুবাড়ি বরিশালে।
বিক্রমপুরের সিরাজদিখানের শেখরনগরে জাইল্লা বানানোর উৎকৃষ্ট কারিগর রয়েছেন। পুরো পরিবার মিলে মাটির দুই অংশ কাঠের গইড়া দিয়ে পিটিয়ে জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ জাইল্লা তৈরি করেন। এই জাইল্লা কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে চ্যাপাশুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণে এবং কিছু পরিমাণ আখের গুড় রাখতে ব্যবহৃত হয়। রাজবাড়ী ও ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ পালবাড়িতে তুলনামূলক ছোট জাইল্লা তৈরি হয়, যা খেজুর ও আখের গুড় রাখার কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়। গরুর খাবার দেওয়ার চাড়ি এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘড়িয়া ও রাজশাহীর প্রেমতলীতে প্রচুর তৈরি হয়। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের পিরোজপুর পালবাড়ি, ঢাকা দক্ষিণের পালবাড়ি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘড়িয়া পালবাড়ির চায়ের কাপ মাত্র ২ টাকায় পাওয়া যায়, যা সারাদেশে সবচেয়ে কম দাম।
ঢাকার রায়েরবাজারের মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য এখন প্রায় অতীত। সেখানে এখন বরিশালের তৈরি মাটির পণ্য বিক্রি ও তন্দুর রুটির চুলা বানানোর কাজ সীমাবদ্ধ। বরিশাল-সাভার-ধামরাইসহ নানা জায়গার মাটির পাত্র নৌকায় করে ঢাকার রায়েরবাজার, গেন্ডারিয়া, ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দের পাইকারি গুদামে পৌঁছায়। সেখান থেকে খুচরো বিক্রেতারা কিনে বিক্রি করেন। এই তিন হাত বদলের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, কিন্তু কুমারেরা তেমন লাভবান হতে পারেন না।
ঐতিহাসিকেরা মৃৎশিল্পকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন—চারুকলামূলক ও কারিগরি মৃৎশিল্প। শৈল্পিক ছোঁয়া বেশি এমন পণ্য শোভাবর্ধনে ব্যবহৃত হয়, আর নকশাবিহীন গৃহস্থালি পণ্য কারিগরি মৃৎশিল্পের আওতাভুক্ত। একসময় বরেন্দ্র অঞ্চলে মাটির পণ্য পোড়ানোর কাজে মহিষের চামড়া ব্যবহার করা হতো, ফলে পণ্যের রং হতো লালচে বাদামি, যাকে টেরাকোটা বলা হতো।
মৃৎশিল্প যে 'হারিয়ে যাচ্ছে'—এই ধারণার সঙ্গে লেখক দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, সব শিল্পই নিজের জায়গায় আছে, শুধু আমাদের খবর রাখার অভ্যাস নেই। দেশের ঐতিহ্যবাহী ও জৌলশপূর্ণ কুমারপাড়াগুলোর নাম অনেকেই জানেন না। ১৮৮৩ সালে ডা. ফওনস নরটন জেমস ওয়াইজের করা শুমারি এবং ১৯৭৪ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানের লোকশিল্প সমীক্ষাই এখনো মূল্যায়নের প্রধান উৎস। এই পুরোনো তথ্যের পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবং সঠিক তথ্য তুলে ধরতে লেখক প্রায় ১২ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন কুমারপাড়া ঘুরে 'মৃৎশিল্প সমীক্ষা'র কাজ করছেন। এই কাজে উৎসাহ দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন শিল্পী নিসার হোসেন। ২০১৭ সালে 'জয়নুল উৎসব'-এ লেখকের 'লোকমেলা-পার্বণ' ছবির প্রদর্শনী এবং ২০২১ সালে 'বাংলাদেশের ব্যবহারিক মৃৎপাত্র' শীর্ষক প্রদর্শনী এই পরিশ্রমের মূল্যায়ন বলে মনে করেন তিনি।
সম্প্রতি বাজারে বাহারি নকশার মাটির তৈজস ও ঘর সাজানোর পণ্যের চাহিদা প্রচুর। বরিশালের বাউফল, কুমিল্লার বিজয়পুর, রংপুর ও কুষ্টিয়ায় কলচালিত চাকে তৈরি মসৃণ ও নতুন নকশার পণ্য এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। বড় বড় কোম্পানি এসব পণ্যের বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত। তবে লেখকের মতে, প্রয়োজন সনাতন মৃৎশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা। মাটির পণ্য বাঁচলে বাঁচবে একটি পেশাজীবী গোষ্ঠী। বিদেশি কাঁচামালের পণ্যের পরিবর্তে দেশি মাটির পণ্য ব্যবহারে বাঁচবে বৈদেশিক মুদ্রা, কমবে আমদানিনির্ভরতা। প্লাস্টিকের বদলে পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত মাটির তৈজস ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে লেখক তাঁর বক্তব্য শেষ করেছেন।




