এখন আর শুধু বৈশাখ মাসেই আম পাওয়া যায় না, সারা বছরই পাওয়া যায়। আসন্ন কার্তিক মাসেও আম পাকবে, এবং তখন বাজারে পাওয়া যাবে কাটিমন জাতের আম। বছরে একাধিকবার ফলন দেয়ার সক্ষমতা থাকায় এই জাতের বাণিজ্যিক চাষাবাদ দেশের বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়েছে। অন্য নতুন জাতের ক্ষেত্রে যেমন নতুন বাগান তৈরি করতে হয়, কাটিমনের ক্ষেত্রে সেই প্রয়োজন হচ্ছে না। চাষিরা তাদের পুরোনো বড় গাছগুলোকে কলম করে (গ্রাফটিং) কাটিমনে রূপান্তরিত করছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই আমের বিস্তার সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়, যার মধ্যে ৪ হাজার ৪৬২ হেক্টর জমিতে এখন কাটিমন চাষ হচ্ছে। রাজশাহীতে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর আমবাগানের মধ্যে কাটিমন হয়েছে ২৪২ হেক্টরে। অন্যদিকে নওগাঁয় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর আম চাষের জমির মধ্যে কাটিমন রয়েছে ১৬০ হেক্টরে।

কার্তিকে আম বাগানে ভরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের শিকারপুর মৌজায় সাত বিঘার একটি বাগানে এখন কাটিমনের চাষ হচ্ছে। বাগানের পুরোনো বড় গাছগুলোর অনেকগুলোই কলম করে কাটিমনে রূপান্তর করা হয়েছে, সেই সাথে বড় গাছগুলোর ফাঁকে লাগানো হয়েছে নতুন কাটিমনের চারা। সম্প্রতি বাগানে গিয়ে দেখা যায়, গাছের ডালে ডালে থোকায় থোকায় ছোট ছোট কাঁচা আম ঝুলছে। পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে আমে ফ্রুট ব্যাগ পরানোর কাজ চলছে। বাগানের নতুন গাছগুলোর বয়স সাড়ে তিন বছর, এবং এই মৌসুমেই প্রথমবারের মতো সেসব গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হবে। কার্তিকের শুরুতেই, এমনকি কয়েক দিন আগেও এসব গাছের আম পাকতে শুরু করবে বলে জানা গেছে।

আমচাষি ও ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন, মো. রেমন খান, আবদুস সবুর, মাহমুদুল হাসান ও আকমল মাহমুদ ইজারা নিয়ে এই বাগানে কাটিমন জাতের আম চাষ করেছেন। বাগানের ইজারাদারদের একজন মাহমুদুল হাসান জানান, সাত বিঘার বাগানে পুরোনো বড় গাছ আছে ৭০টি এবং নতুন কাটিমনের চারা লাগানো হয়েছে ৩০০টি। ছোট গাছগুলোকে বেশি বড় হতে না দিয়ে নিয়মিত ডাল ছাঁটাই করার পরিকল্পনা তাদের। তাতে নতুন পাতা গজাবে এবং নতুন নতুন ডালে আমও বড় হবে। গাছের এই কাঁচা আমগুলো পাকবে আগামী কার্তিক মাসে।

শিকারপুর গ্রামের বাগানটিতে আগে লকনা, গোপালভোগ, আশ্বিনাসহ বিভিন্ন জাতের আমগাছ ছিল, যার বেশির ভাগের বয়স প্রায় ১৫ বছর। সেই গাছগুলোর কয়েকটিকে কলম করে কাটিমনে রূপান্তর করা হয়েছে। বাগানের অংশীদার সাহাবুদ্দিন একটি পুরোনো লকনগাছ দেখিয়ে বললেন, এই গাছ থেকে আগে সর্বোচ্চ পাঁচ মণ আম পাওয়া যেত, যা বাজারে প্রতি মণ প্রায় চার হাজার টাকায় বিক্রি হতো। এখন সেই গাছেই কাটিমন ধরেছে, যা প্রতি মণ সাত থেকে আট হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আশ্বিন-কার্তিকে আম পাকলে মিষ্টতা বাড়বে এবং তখন প্রতি মণ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। সাহাবুদ্দিনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান দামেও একটি বড় গাছ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকার আম বিক্রি হতে পারে। তবে কাটিমনের পরিচর্যার খরচ লকনার তুলনায় বেশি বলেও জানান তিনি।

বাগানে দেখা গেল, পুরোনো মুকুল ও কিছু নতুন পাতা ভেঙে দিচ্ছেন সাহাবুদ্দিন। তাঁর ব্যাখ্যা, পুরোনো মুকুল ও পাতাগুলো গাছের খাবার নষ্ট করছে, তাই সেগুলো সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে গাছের শক্তি ফলনে কাজে লাগে। ছোট গাছগুলোতে গত বছরই মুকুল এসেছিল, কিন্তু প্রথম বছর আম নিলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ত, তাই সাড়ে তিন বছর পর এই মৌসুমে তাঁরা আম সংগ্রহ করবেন।

কাটিমনের চাষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো আমগাছের জাত বদলে কাটিমনে রূপান্তরের কাজও বেড়েছে। কিছু যুবক এই কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। শিবগঞ্জ উপজেলার লিচুবাগান গ্রামে এমনই এক বাগানে কাজ করছিলেন মো. রনি ও আবির হোসেন। তাঁরা বলেন, একটি গাছের প্রায় আড়াই ইঞ্চি কচি ডগা অন্য গাছে প্রতিস্থাপন করতে হয়, যাতে সময় লাগে বড়জোর এক মিনিট। প্রতিটি ডগা প্রতিস্থাপনের জন্য তাঁরা চার থেকে পাঁচ টাকা পারিশ্রমিক নেন। রনি জানান, গ্রাফটিংয়ের প্রায় ২০ দিনের মধ্যে বোঝা যায় টেপ লাগানো ডালটি টিকে থাকবে কি না। ডালটি বেঁচে গেলে নতুন পাতা গজায়, তবে টেপের ভেতরে পানি ঢুকলে সমস্যা হয়, তাই প্রয়োজন অনুযায়ী বালাইনাশকও ব্যবহার করতে হয়।

কাটিমন জাতের আমের বৈশিষ্ট্যই চাষিদের আগ্রহের বড় কারণ। বছরে তিনবার ফলন দেয় এই জাত। গড় ওজন প্রায় ৩৯৬ গ্রাম, আকৃতি লম্বাটে, শাঁস হালকা হলুদ, বুনট দৃঢ় ও কিছুটা রসালো। খাদ্যোপযোগী অংশ প্রায় ৭৮ শতাংশ, খোসা মাঝারি মোটা ও সহজে ছাড়ানো যায় এবং আঁটি পাতলা। কাঁচা ও পাকা—দুই অবস্থাতেই খাওয়া যায় এই আম। হেক্টরপ্রতি ফলন ১৫ থেকে ১৮ টন পর্যন্ত হতে পারে। সংরক্ষণক্ষমতাও ভালো হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এর চাহিদা বাড়ছে। তবে দেশে এখনো কাটিমনকে স্বীকৃত জাত হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, যদিও মাঠপর্যায়ে এর চাষ বেড়েছে।

রাজশাহী ফল গবেষণাকেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, কাটিমন থাইল্যান্ডের আম, যা আট থেকে ১০ বছর আগে বাংলাদেশে এসেছে। ব্যাপক পরিচিতি পাওয়ায় এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, যত দিন কাটিমনের উৎপাদন বেশি হচ্ছে না, তত দিন এটি চাষিদের জন্য লাভজনক থাকবে। আমচাষিদের কাছে কাটিমনের আকর্ষণ শুধু বছরে একাধিকবার ফলন নয়, অসময়ে আম পাওয়ার সুযোগও। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের আমের ভিড় পেরিয়ে যখন বাজারে দেশি আমের সরবরাহ কমে আসে, তখন কার্তিকের কাটিমন হয়ে উঠতে পারে নতুন বিকল্প।