গত জুলাইয়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে টানা আট দিনের বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা যে কেবল প্রাকৃতিক কারণে হয়েছিল, তা নয়। খালে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ও পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতাই মূলত বিপর্যয় ডেকে এনেছে বলে উঠে এসেছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে দেখা পাওয়া তথ্যে। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বন্যায় ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কাঁথারিয়া ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামের কৃষক আবুল খায়েরের (৬৫) মতো মানুষ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না। তাঁর ঘরের টিনের দেওয়ালে পানির দাগ, নষ্ট হওয়া আসবাব আর ধান-চাল—সব মিলিয়ে জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা এটি। তিনি মনে করেন, শুধু ভারী বৃষ্টিই দায়ী নয়; তাঁর বাড়ির পাশের সোনাইমুড়ি খালে মাছ চাষের জন্য নির্মিত ইটের দেওয়াল পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছিল। টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের পানি সেই বাধা পেরোতে না পেরে কয়েক দিন লোকালয়ে আটকে ছিল, যা পরে ভয়াবহ বন্যার রূপ নেয়।

শুধু আবুল খায়েরের অভিযোগই বিচ্ছিন্ন নয়। বাঁশখালী ও কক্সবাজারের চকরিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও মাছ চাষের জন্য খালের মুখে স্লুইসগেট বন্ধ রাখা হয়েছে, কোথাও তৈরি করা হয়েছে মাটির বাঁধ, বাঁশের বেড়া বা বালুর বস্তার প্রতিবন্ধকতা। লবণাক্ত পানি ঠেকাতে বছরের পর বছর বন্ধ রাখা হয়েছে সরকারি স্লুইসগেটও। বন্যার সময়ও এসব বাধা সরানো হয়নি, ফলে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি স্বাভাবিক পথে নদী বা সাগরে নামতে পারেনি। দিনের পর দিন আটকে থেকে ঘরবাড়ি ডুবে গেছে, মাটির ঘর ভেঙে পড়েছে, ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে বহুগুণ। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) ২০১৭ সালের জরিপেও এই সমস্যার চিত্র উঠে এসেছিল। বাঁশখালীতে পাউবোর ৮৯টি স্লুইসগেট শনাক্ত করা হয়েছিল, পাশাপাশি খাল-বিল ও জলাশয়ে পানি আটকে রাখতে অন্তত ১৫৭টি অবৈধ প্রতিবন্ধকতার অস্তিত্বও মিলেছিল।

কাঁথারিয়া ইউনিয়নের সোনাইমুড়ি খালে প্রায় ২০ ফুট প্রশস্ত খালের ভেতরে মাছ চাষের জন্য দুই ধাপে ইটের দেওয়াল তুলে পানিপ্রবাহ সংকুচিত করে রাখা হয়েছিল। পানি চলাচলের জন্য রাখা হয়েছিল মাত্র ৩ ফুট জায়গা। স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন ইউপি সদস্য মো. আনসার এই প্রতিবন্ধকতা নির্মাণ করেন। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তখন কেউ প্রতিবাদ করেননি; ক্ষমতার পালাবদলের পরও কাঠামোটি থেকে যায়। এবারের বন্যায় পাহাড়ি ঢল খাল দিয়ে নামতে না পেরে আশপাশের বিল, বসতঘর ও সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। পরে উপজেলা প্রশাসন খননযন্ত্র দিয়ে বাঁধের একাংশ কেটে দিলেও পুরো কাঠামো অপসারণ করা যায়নি। ঘটনার ২৬ জুলাই সরেজমিনে দেখা যায়, খালের ভেতরে ইটের দেওয়ালের বড় অংশ এখনো পড়ে আছে, আর মাত্র ৫০ মিটার দূরে পাউবোর একটি স্লুইসগেটের কার্যকারিতাও এই বাধার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে মো. আনসার দাবি করেছেন, লবণাক্ত পানি ঠেকিয়ে চাষাবাদের সুবিধার জন্য আগে থেকেই সেখানে দেওয়াল ছিল এবং তিনি ২০১৯ সালে ইজারা নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছেন।

একই চিত্র বাহারছড়া ইউনিয়নের রত্নপুর গ্রামেও। জলকদর খালের সঙ্গে যুক্ত একটি খালের মুখে এক ভেন্টের স্লুইসগেট দীর্ঘদিন ধরে মাছ চাষের স্বার্থে বন্ধ রাখা হচ্ছিল। আগে গেটটি নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মো. জামাল; ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রণ নেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মৌলভি ছগির ও মনসুর। এবারের বন্যায় গেটটি পুরোপুরি না খোলায় প্লাবিত হয় পুরো গ্রাম। রত্নপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল জানান, অসুস্থ সন্তান নিয়ে হাসপাতালে থাকাকালীন খবর পান, বাড়িতে পানি ঢুকছে। ঘরে একা ছিলেন তাঁর বৃদ্ধ মা; কোমরপানি তলিয়ে যায় বসতঘর, নষ্ট হয় প্রায় সব আসবাব। অন্যদিকে, তুফান আলী তালুকদার এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারাই দীর্ঘদিন একটি স্লুইসগেট বন্ধ রেখেছিলেন লবণাক্ত পানি ঠেকাতে, ফলে গেটটি অকেজো হয়ে পড়ে। ভারী বৃষ্টিতে সেই গেট দিয়ে পানি বের হওয়ার কথা থাকলেও তা আর সম্ভব হয়নি; কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো এলাকা ডুবে যায় এবং ৫০ থেকে ৬০টি মাটির ঘর ধসে পড়ে।

চকরিয়া ও মাতামুহুরীতেও পানিনিষ্কাশনের প্রধান পথ ঢেমুশিয়া ক্রসড্যাম স্লুইসগেট। স্থানীয়দের অভিযোগ, টানা বৃষ্টির সময় গেটটি তিন দিন কার্যত বন্ধ ছিল, ফলে সাতটি ইউনিয়নের অন্তত ৮৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। বাসিন্দাদের ভাষ্য, ১২ ফুট উচ্চতার গেটের নিচের ৪ ফুট কাঠ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল এবং ওপরের অংশে জাল বসিয়ে মাছ ধরা হচ্ছিল। পরিবেশকর্মী আলাউদ্দিন আলোর ফেসবুক লাইভে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে গেট খুলে দেন। তবে প্রশাসন চলে যাওয়ার পর আবারও গেট আটকে দেওয়া হয়। যদিও ঢেমুশিয়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গেট খুলে দেওয়া হয়েছিল। ছয়কুড়িটিক্কাপাড়া, বাংলাবাজার ও গোদারপাড়া স্লুইসগেটও বন্যার শুরুতে কয়েক দিন বন্ধ ছিল বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

পানির স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সরকারি পানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রকট। একসময় বাঁশখালীতে পাউবোর ৮৯টি স্লুইসগেট ছিল; এখন আছে ৭০টি, যার মধ্যে ১৪টিই অকার্যকর। অর্থাৎ কার্যকর অবস্থায় আছে মাত্র ৫৬টি। আইডব্লিউএম ও পাউবোর জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ স্লুইসগেট পাকিস্তান আমলের, যা অতি ভারী বর্ষণ বা পাহাড়ি ঢলের চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রাখে না। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক গেট অচল হয়ে পড়েছে, কোনোটি ঘিরে গড়ে উঠেছে দোকানপাট। ২০২২ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পাউবোর করা গবেষণাতেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, উপকূলের পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং অপরিকল্পিত বাঁধ ও দখলদারি ভবিষ্যতে বড় বন্যার ঝুঁকি তৈরি করবে।

পরিবেশ ও পানিসম্পদবিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেছেন, উপকূলের বাঁধগুলো মূলত জোয়ার ঠেকানোর জন্য তৈরি, কিন্তু ভেতরের বৃষ্টির পানি দ্রুত বের করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা অবৈধ বাঁধ ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করতে হবে, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং স্লুইসগেটগুলোর কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে পুনর্নির্মাণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের বাইরে এনে জনস্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা নিশ্চিত করা। বাঁশখালীর বাঘমারা গ্রামের আবুল খায়েরের ঘরের টিনের দেওয়ালে বন্যার পানির দাগ হয়তো একসময় মুছে যাবে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে—অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলকে দুর্যোগে রূপ নেওয়ার আগেই পানি নামার স্বাভাবিক পথগুলো কি এবার খোলা রাখা হবে?