মানব ইতিহাসের এক অনন্য শিক্ষণীয় অধ্যায় হলো পবিত্র কোরআনে বর্ণিত নবী মুসা ও খিজিরের (আ.) সাক্ষাৎ। সুরা কাহফের ৬৮ নম্বর আয়াতে খিজির (আ.) মুসা (আ.)-কে সতর্ক করে বলেছিলেন, যেখানে তার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান নেই, সেখানে ধৈর্য ধারণ করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। জবাবে মুসা (আ.) অঙ্গীকার করেছিলেন যে, আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি ধৈর্যশীল হবেন এবং কোনো আদেশ অমান্য করবেন না (সুরা কাহফ, আয়াত: ৬৯)। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, নিজের জ্ঞানের সীমা স্বীকার করে নেওয়া এবং অজানা বিষয়কে আল্লাহর প্রজ্ঞার ওপর ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত প্রজ্ঞা।

একবার বনি ইসরাইলের এক সমাবেশে মুসা (আ.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার চেয়ে জ্ঞানী কেউ আছে কি না। উত্তরে আল্লাহ তাকে খিজিরের কথা জানিয়ে দেন, যিনি কিছু বিষয়ে অধিক জ্ঞান রাখেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২২)। মুসা (আ.) ছিলেন 'কালিমুল্লাহ' তথা আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার মর্যাদাপ্রাপ্ত নবী; তবুও আল্লাহ দেখিয়ে দিলেন যে, একজন মানুষের পক্ষে সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। এখানেই জ্ঞানের প্রতি বিনয়ের শিক্ষা নিহিত।

খিজিরের (আ.) সঙ্গী হয়ে মুসা (আ.) ধৈর্যের প্রতিশ্রুতি দিলেও, খিজির যখন আপাতদৃষ্টিতে অন্যায় কাজ করছিলেন, তখন তিনি চুপ থাকতে পারেননি। কারণ, তার কাছে শরিয়তের সুস্পষ্ট মানদণ্ড ব্যক্তির চেয়ে অনেক বড় ছিল। বাহ্যিক অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করাই একজন সচেতন মানুষের কর্তব্য। সমাজে কখনো কখনো কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের অজুহাতে স্পষ্ট অন্যায়কে সমর্থন করার চেষ্টা দেখা যায়। অথচ মুসা (আ.)-এর এই অবস্থানই আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সত্য ও আদর্শের মানদণ্ড যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে ঊর্ধ্বে।

ইমাম মালিক (রহ.)-এর একটি উক্তিও এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলতেন, এমন অনেক শিক্ষক রয়েছেন, যাদের কাছে তিনি দোয়ার জন্য যেতেন, কিন্তু তাদের কাছ থেকে হাদিসের বর্ণনা নিতেন না। অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা আর নির্দিষ্ট বিষয়ে তার দক্ষতা এক নয়; তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞের কাছেই ফিরে যাওয়া উচিত।

অসম্পূর্ণ জ্ঞান ও তাড়াহুড়ার পরিণতি সম্পর্কে খিজিরের (আ.) উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন মানুষ কোনো ঘটনার অন্তর্নিহিত কারণ বা চূড়ান্ত ফলাফল বুঝতে পারে না, তখন সে অধৈর্য হয়ে পড়ে। এর শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হলো হোদাইবিয়ার সন্ধি। বাহ্যিকভাবে চুক্তির শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অপমানজনক মনে হওয়ায় অনেক সাহাবি ব্যথিত ও অস্থির হয়ে পড়েছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১)। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই সন্ধিকে 'স্পষ্ট বিজয়' হিসেবে ঘোষণা করেন (সুরা ফাতহ, আয়াত: ১)। সাহাবিরা তখন সেই চুক্তির দূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামাজিক ফলাফল দেখতে পাননি।

আজকের তরুণদের মাঝেও যখন আবেগের উত্তাপ থাকে, তখন আবেগপ্রবণ নেতৃত্ব তাদের ক্ষণিকের মধ্যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলে, দূরদর্শিতার অভাবে তারা হতাশায় পড়ে এবং অনেকে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। অনেকে বুঝতে চান না, কোন বিষয়টি কখন অগ্রাধিকার পাবে। ইসলামি বিধানে কিছু বিষয় ধ্রুব ও অপরিবর্তনীয়, আবার কিছু বিষয় পরিপার্শ্বিক অবস্থার আলোকে নমনীয়। এই নীতিকে বলা হয় 'ফিকহুল আওলাবিয়্যাত' বা অগ্রাধিকার নির্ধারণের নীতি।

যেমন, দুর্ভিক্ষের সময় মানুষকে খাদ্য দেওয়া নফল হজের চেয়ে বেশি জরুরি; কিংবা দেশ ও সমাজ রক্ষা করা সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজের চেয়ে অগ্রাধিকার পায় (আল-গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন)। সমাজ সংস্কার বা জীবনের জটিল সংকট মোকাবেলার মূল শর্ত হলো বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করা এবং আল্লাহর সুনির্দিষ্ট নিয়মের ওপর আস্থা রেখে ধৈর্য ধারণ করা।

সামাজিক পরিবর্তন এক দিনে বা অলৌকিকভাবে ঘটে না; তা ধীরে ধীরে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধিত হয়। আল্লাহ তাআলা নবীজিকে (সা.) লক্ষ্য করে বলেছেন, "আমি তাদের যে প্রতিশ্রুতির কথা বলি, তার কিছুটা যদি আপনাকে দেখিয়ে দিই কিংবা আপনার মৃত্যু ঘটাই—আপনার দায়িত্ব তো শুধু বার্তা পৌঁছে দেওয়া, আর হিসাব নেওয়ার দায়িত্ব আমার।" (সুরা রা'দ, আয়াত: ৪০)। তাই গাছ রোপণ করেই ফল খাওয়ার তাড়াহুড়া প্রজ্ঞার পরিচয় নয়। অসম্পূর্ণ জ্ঞান নিয়ে তাড়াহুড়ো করার চেয়ে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ধীরপদে এগিয়ে যাওয়াই পরম বুদ্ধিমত্তা।