জীবনে পরিবর্তন প্রত্যেকেরই কাম্য। অভাবী ব্যক্তি সচ্ছলতা চায়, পাপী মুক্তি খোঁজে, আর অস্থির হৃদয় চায় প্রশান্তি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই পরিবর্তন পেতে প্রয়োজনীয় প্রথম পদক্ষেপটি আমরা প্রায়ই নিতে চাই না। অনেকের ধারণা, নির্ধারিত সময় এলেই সবকিছু আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যাবে। এমন প্রতীক্ষায় জীবন ও প্রজন্ম পেরিয়ে যায়, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আর হাতে আসে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা পরিবর্তনের একটি চিরন্তন নিয়ম বাতলে দিয়েছেন, যা এই নিষ্ক্রিয় প্রতীক্ষার মানসিকতাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শেখায়। সুরা রাদের ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। সংক্ষিপ্ত এই আয়াতের বক্তব্য অত্যন্ত গভীর। নিজের সাধ্যের মধ্যে যা কিছু পরিবর্তন সম্ভব, সেটুকু করা-ই পরিবর্তনের প্রথম শর্ত। বাকিটা মহান রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া। বান্দার দায়িত্ব চেষ্টা করা, আর ফলাফল প্রদান আল্লাহর একান্ত ক্ষমতা।
মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা কোনো জাতিকে প্রদত্ত নেয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত ফিরিয়ে নেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা ইমান, আমল ও আনুগত্য নষ্ট করে বসে। ইবনে কাসিরের তাফসিরে সুরা রাদের এই আয়াতের এমনই ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মহানবী (সা.) যেভাবে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিলেন, তাতে বাহ্যিক অবস্থার সঙ্গে মানুষের ভেতরের অবস্থার গভীর সম্পর্ক স্পষ্ট। ভেতরের জগৎ বদলানো না গেলে বাইরের পরিস্থিতিও বদলায় না—ব্যক্তি কিংবা জাতি, সবার ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ নিজের চেষ্টায় একাই সবকিছু বদলে দিতে পারে। পরিবর্তনের চূড়ান্ত ক্ষমতা আল্লাহরই হাতে, কিন্তু তার নিয়ম হলো বান্দা আগে উদ্যোগ নেবে, পরে তিনি ফল দেবেন।
সচ্ছলতা লাভের ইচ্ছা থাকলেও যদি কেউ চাকরিতে আবেদন, ব্যবসার নতুন সুযোগ খোঁজা কিংবা দক্ষতা বৃদ্ধির মতো প্রয়োজনীয় কাজ না করে, তবে তা আল্লাহর বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বৈষয়িক চেষ্টার পাশাপাশি রিজিক বৃদ্ধির জন্য কোরআন-হাদিসে কিছু আধ্যাত্মিক পথের কথাও বলা হয়েছে। হারাম উপার্জন পরিহার করলে আল্লাহ উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যেমনটি সুরা তালাকের ২-৩ নম্বর আয়াতে ঘোষিত। নিজের বিদ্যমান অবস্থার জন্য আল্লাহর প্রতি মন থেকে কৃতজ্ঞ হওয়াও রিজিক বৃদ্ধির মাধ্যম, যার প্রতিশ্রুতি সুরা ইব্রাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে আছে। এছাড়া দান করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার কথাও বলেছেন মহানবী (সা.), যাতে রিজিক প্রশস্ত হয় এবং আয়ু বৃদ্ধি পায় (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫,৯৮৬)।
আধ্যাত্মিক জীবনে আল্লাহর প্রিয় হওয়ার জন্যও একই নিয়ম প্রযোজ্য। পাপ ছাড়তে চাইলেও যদি সেই পাপের মাধ্যম, যেমন পথভ্রষ্ট অ্যাপ বা খারাপ আড্ডা ত্যাগ করা না হয়, তবে পরিবর্তনের আশা করা অর্থহীন। ভুল পথে টেনে নেওয়া সঙ্গ ত্যাগ করে সৎ মানুষের সাহচর্য গ্রহণের চেষ্টা করতে হবে। সুরা আনকাবুতের ৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, যারা তার পথে চেষ্টা-সাধনা করে, তিনি অবশ্যই তাদের পথ দেখাবেন। অর্থাৎ হেদায়াত পাওয়ার শর্তই হলো চেষ্টা করা।
এই আয়াতের মূল শিক্ষা মানুষকে অলসতা ও অজুহাতের মানসিকতা থেকে জাগ্রত করা। ‘ভাগ্যে থাকলে হবে’ বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকা তাওয়াক্কুল নয়; বরং সাধ্যমতো চেষ্টা করে ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত তাওয়াক্কুল। এক ব্যক্তি মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, উট ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন নাকি বেঁধে রাখবেন? জবাবে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, আগে উট বেঁধে নাও, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২,৫১৭)। এতে বোঝা যায়, উপায় অবলম্বন করা আল্লাহ-ভরসার বিপরীত নয়, বরং সেটিই প্রথম ধাপ।
নিজের জীবনে, পরিবারে বা সমাজে যে পরিবর্তনই কাম্য হোক, প্রশ্নটি নিজেদের কাছেই করতে হবে—এর জন্য আমরা নিজেরা কী পদক্ষেপ নিয়েছি। আল্লাহর সাহায্য তখনই আসে, যখন বান্দা প্রথম পদক্ষেপ নেয়। পরিবর্তন আসলে দূরের কিছু নয়; এর চাবিকাঠি আল্লাহ আমাদের হাতের নাগালেই রেখেছেন, শুধু প্রয়োজন নিজের পরিবর্তনের আন্তরিক ইচ্ছা।




