রাতের আকাশের সবচেয়ে পরিচিত এই প্রতিবেশী আসলে এক বিস্ময়কর জগৎ। চাঁদের বুকে কোটি কোটি বছর আগের উল্কাপাতের দাগ আজও স্পষ্ট, যা তার প্রাচীন ও ঘটনাবহুল ইতিহাসের সাক্ষী। কিন্তু এই উপগ্রহের ভবিষ্যৎ কী? বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে তিনটি মূল কারণের ওপর— এর জন্মকাহিনি, পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব এবং সর্বোপরি সূর্যের ভবিষ্যৎ বিবর্তন।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর জন্মের কিছু কোটি বছর পর থিয়া নামের এক গ্রহ-আকৃতির বস্তু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে। সেই প্রচণ্ড সংঘর্ষে পৃথিবীর অনেক উপাদান মহাকাশে ছিটকে পড়ে, যা পরে জমাট বেঁধে চাঁদের সৃষ্টি হয়। সেদিন চাঁদ ছিল পৃথিবীর মাত্র ২০ হাজার কিলোমিটার দূরে, বর্তমানে এই দূরত্ব গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার কিলোমিটার। তখন চাঁদকে আকাশে এত বড় দেখাত যে, হাতের মুঠির সমান।
পৃথিবীর শক্তিশালী মহাকর্ষ বল চাঁদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। দূরত্বের কারণে চাঁদের পৃথিবী-মুখী দিকে টান বেশি হয় এবং বিপরীত দিকে কম। এই টানের তারতম্যে চাঁদ কিছুটা ডিমের মতো লম্বাটে আকার ধারণ করেছে। আদিম যুগে চাঁদ নিজের অক্ষে খুব দ্রুত ঘুরত, কিন্তু পৃথিবীর এই টান তার গতি ক্রমশ কমিয়ে দেয়। হারানো ঘূর্ণন শক্তি কক্ষপথের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে চাঁদকে ধীরে ধীরে দূরে ঠেলে দেয়। একসময় চাঁদের নিজের ঘূর্ণন ও পৃথিবী প্রদক্ষিণের সময় সমান হয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় টাইডাল লকিং বলে। এ কারণেই আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের সবসময় একই দিক দেখতে পাই।
এই মহাকর্ষীয় টান কিন্তু একতরফা নয়; চাঁদও পৃথিবীকে টানে, যার ফলে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা হয়। পৃথিবী ঘোরে বলে এই জোয়ারের পানির ঘর্ষণ পৃথিবীর ঘূর্ণন গতিও কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে পৃথিবীর দিনও ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছে — প্রতি ১০০ বছরে দিন মাত্র দুই মিলি-সেকেন্ড বাড়ে। এই প্রক্রিয়ার ফলেই চাঁদ প্রতি বছর প্রায় ৪ সেন্টিমিটার করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন পৃথিবীর ঘূর্ণন ও চাঁদের কক্ষপথের সময় সমান হয়ে যাবে, তখন আকাশের কোনো এক স্থানে চাঁদকে স্থির দেখা যাবে — উঠাও যাবে না, অস্তও যাবে না। তবে সেটি ঘটতে কয়েকশ কোটি বছর লাগবে।
কিন্তু এই ধারাবাহিকতায় বাধা আসবে সূর্যের কারণে। সূর্য প্রতিনিয়ত তার কেন্দ্রে হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম তৈরি করছে, ফলে এটি আরও উজ্জ্বল ও উত্তপ্ত হচ্ছে। আজ থেকে প্রায় ১০০ কোটি বছর পর সূর্যের তাপে পৃথিবীর সব মহাসাগরের পানি ফুটে বাষ্প হয়ে যাবে। মহাসাগর না থাকলে জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণ থাকবে না, ফলে চাঁদ দূরে সরে যাওয়ার গতি এবং পৃথিবীর দিন বড় হওয়ার প্রক্রিয়া থেমে যাবে।
আজ থেকে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি বছর পর সূর্যের জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে এটি ফুলে-ফেঁপে বিশাল লাল দানবে পরিণত হবে। বিজ্ঞানীরা তর্ক করছেন সূর্য পৃথিবীকে গিলে ফেলবে কি না, তবে এতটুকু নিশ্চিত যে পৃথিবী ও চাঁদ তখন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এরপর সূর্য তার বাইরের স্তর ছুড়ে ফেলে একটি ছোট শ্বেত বামন তারায় পরিণত হবে, যা হাজার কোটি বছর ধরে শীতল হতে থাকবে। সেই অবস্থায় সূর্যের মহাকর্ষ বল চাঁদের কক্ষপথকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে — চাঁদ হয়তো মহাকাশে হারিয়ে যাবে কিংবা পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়বে। কিন্তু ততদিনে পৃথিবীতে প্রাণ বা পানি কোনো কিছুই থাকবে না। মহাবিশ্বের এই ঘটনাগুলো ঘটতে এখনও শত শত কোটি বছর বাকি, তাই যতদিন চাঁদ আকাশে আছে, তার সৌন্দর্য উপভোগ করাই শ্রেয়।




