তীব্র তাপদাহে দক্ষিণ কোরিয়ার কৃষি ও জনজীবনে অভূতপূর্ব সংকট দেখা দিয়েছে। গত ২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইয়াংসানে তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, যা ১৯০৪ সাল থেকে আধুনিক রেকর্ডের সর্বোচ্চ। তুলনামূলকভাবে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২০২২ সালের জুলাইয়ে ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি। প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মন্ত্রিসভাকে জানিয়েছেন, দেশের ইতিহাসে এমন আবহাওয়া আগে দেখা যায়নি; চরম আবহাওয়া ধীরে ধীরে নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে এবং জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি গ্যাংওন প্রদেশে এই তাপের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফসলের ওপর। ইয়াংগু কাউন্টির হেয়ান এলাকায় চাষাবাদকারী লি সাং-হিউক স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম SBS-কে জানান, মাটির নিচে আলু নরম হয়ে ‘সেদ্ধ’ হওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে; খেত খুঁড়ে তোলার উপযোগী কিছুই অবশিষ্ট নেই। চার দশকের অভিজ্ঞতায় তিনি এমন দৃশ্য কখনো দেখেননি বলে উল্লেখ করেন। কাছের কয়েক হাজার পিয়ং জায়গাজুড়ে বাঁধাকপির খেতও পুড়ে গেছে; ভালো দামের প্রত্যাশায় ফসল তুলতে বিলম্ব করায় মাঠেই সেগুলো নষ্ট হয়। পরে চাষ দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়, যার মূল্য ছিল কয়েক কোটি ওন। প্রদেশটির চুনচন, হংচন ও হোয়ংসং শহরে চলতি মাসে প্রথমবারের মতো চরম তাপপ্রবাহজনিত সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

কেবল সবজিই নয়, ফলের বাগানেও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। সরাসরি রোদের তাপে আপেলের খোসা পুড়ে রঙ বদলে যাচ্ছে এবং পিচ ফল ফেটে যাচ্ছে। আপেলচাষি চন জং-তে SBS-কে বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চুসক উৎসবের সময় পাকা হওয়ার কথা ছিল যে আপেলগুলো, সেগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি থেমে গেছে। শুধু সূর্যের দিকে থাকা অংশ লাল হচ্ছে; তাপ অব্যাহত থাকলে ফল সাদা হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে পিচচাষি পার্ক ওন-সন জানান, সরকারের দিনের গরমে ঘরে থাকার পরামর্শ মেনে চলা সম্ভব নয়, কারণ খেতের ফল পচে যাচ্ছে।

মানুষ ও প্রাণীর ওপরও এই গরমের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থার তথ্য অনুসারে, অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে; ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারে চাষ করা ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে। কৃষকেরা বলছেন, খেতের ফসল রক্ষার জন্য তাপের সময়ও মাঠে থাকতে হচ্ছে, যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে।

আঞ্চলিক পর্যায়েও তাপের বিস্তার লক্ষণীয়। জাপানের কয়েকটি স্থানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি বা তার বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। হংকংয়ে তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা ১৮৮৪ সালে রেকর্ড রাখা শুরুর পর সর্বোচ্চ। চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের একটি আবহাওয়া কেন্দ্রে জুলাইয়ে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সাম্প্রতিক ‘State of the Climate in Asia’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩৫ বছরে এশিয়ায় উষ্ণতা বৃদ্ধির হার তার আগের তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

বিজ্ঞানীদের গবেষণাও এই ঝুঁকির দিকটি তুলে ধরেছে। ২০২৪ সালে Potato Research সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, জলবায়ু পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় গ্রীষ্মকালীন আলু চাষের জন্য তাপসহনশীল আলুর জাত প্রয়োজন হবে। জার্মানির Leibniz Center for Agricultural Landscape Research ও Brandenburg University of Technology-এর বিজ্ঞানীদের করা ওই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বসন্তকালীন আলুর ক্ষেত্রে আগাম চাষের মাধ্যমে ফলন উন্নত হতে পারে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রধানত মৃত্যু ও গবাদিপশুর ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে; ফসলের ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। খাদ্যপণ্যের দাম আগে থেকেই বেশি থাকায়, সেপ্টেম্বরের চুসক উৎসবকে সামনে রেখে মূল্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। অস্থায়ী স্বস্তির আগে দেশটিতে তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল; ঝড়ের কারণে সাময়িক স্বস্তি এলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।