কাজাখস্তানের বালখাশ হ্রদের তীরে ৩১ জুলাই অবমুক্ত করা হলো রাশিয়া থেকে আনা 'উমিত' নামের একটি স্ত্রী বাঘকে। কাজাখ ভাষায় 'উমিত' শব্দের অর্থ আশা, যা হারিয়ে যাওয়া প্রজাতিটিকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টারই প্রতীক। দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিকল্পনার পর এই বাঘ অবমুক্তির মাধ্যমে বিলুপ্ত বাঘের পুরোনো বিচরণক্ষেত্র পুনরুদ্ধারে বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে নজির গড়ল কাজাখস্তান, যেখানে ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে কোনো বাঘের অস্তিত্ব ছিল না।

বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য, এই এলাকায় অন্তত ৫০টি বাঘের একটি টেকসই জনসংখ্যা গড়ে তোলা। রাশিয়া থেকে আনা আরেকটি পুরুষ বাঘকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে; বনে একা বেঁচে থাকার সক্ষমতা অর্জন করলে তাকেও ছেড়ে দেওয়া হবে। এছাড়া, দুটি বাঘের বাচ্চাকে মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে রেখে বিশেষ যত্নে লালন-পালন করা হচ্ছে, যাতে তারা বুনো পরিবেশে শিকার করে বাঁচতে শেখে এবং আগামী বছর তাদেরও বনে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হয়। ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, গাড়ির দরজা খুলে দিতেই বাঘটি লাফ দিয়ে দ্রুত ঝোপঝাড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে কাজাখস্তানের পরিবেশমন্ত্রী ইয়ারলান নিসানবায়েভ বলেন, বাঘের দেখভাল ও সংখ্যা বৃদ্ধিতে সামনে আরও কাজ বাকি, তবে আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপটি সম্পন্ন হয়েছে।

পশমের জন্য অতিরিক্ত শিকার, বন ধ্বংস ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় ১৯৭০-এর দশকেই কাস্পিয়ান বাঘ বিলুপ্ত বলে ধরা হয়েছিল। একসময় পূর্ব তুরস্ক থেকে উত্তর-পশ্চিম চীন, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, ইরান ও মধ্য এশিয়ার বিশাল অঞ্চলজুড়ে এদের বিচরণ ছিল। নদীতীরবর্তী তুগাই অরণ্য ছিল এদের প্রধান আবাস, যা কৃষিকাজ সম্প্রসারণের ফলে নষ্ট হয়ে যায়। ২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণার ছয় বছর পর বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, কাস্পিয়ান ও রাশিয়ার আমুর বাঘের জিনগত গঠন প্রায় অভিন্ন। ধারণা করা হয়, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত এরা একসঙ্গে চলাফেরা করত; পরে শিকারের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সাইবেরিয়া থেকে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়া বাঘগুলোর একটি অংশই পরবর্তীতে কাস্পিয়ান বাঘ হিসেবে পরিচিতি পায়। সাইবেরিয়ান বাঘ বিশেষজ্ঞ ও ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির রাশিয়া কর্মসূচির প্রধান ডেল মিকুয়েলের মতে, এটিকে কাস্পিয়ান বাঘের ফিরে আসাই বলা চলে, তবে এবার তারা হেঁটে নয়, উড়ে এসেছে। বিলুপ্ত একটি উপপ্রজাতিকে ফিরিয়ে আনার এই ভাবনা ব্যতিক্রমী এবং বাঘটিকে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কাছাকাছি উদ্যোগ।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাস্পিয়ান বাঘের আগের মতো বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়া অসম্ভব। ২০১৭ সালের এক গবেষণায় বাঘের জন্য উপযুক্ত দুইটি স্থান চিহ্নিত করা হয়, যা দুটোই কাজাখস্তানে অবস্থিত। এর মধ্যে সবচেয়ে উপযোগী ইলি-বালখাশ এলাকাটিতেই উমিতকে অবমুক্ত করা হয়েছে এবং ২০১৮ সালে সরকার এলাকাটিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে বাঘ স্থানান্তরের এটাই প্রথম ঘটনা। এর আগে রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলে আমুর বাঘের বিচরণক্ষেত্র সম্প্রসারণে সফল প্রকল্প পরিচালিত হয়েছিল, যেখানে শিকারিদের হাতে মা-বাবা হারানো বাচ্চাদের উদ্ধার করে মানুষের সংস্পর্শের বাইরে বড় করে বনে ছেড়ে দেওয়া হতো। মিকুয়েলের পরিচালনায় সেই প্রকল্পে বাঘের বাচ্চাদের বেঁচে থাকার হার প্রায় শতভাগ ছিল; অবমুক্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি তরুণ বাঘ হিমালয়ান কালো ভালুক শিকার করেছিল, যা নতুন পরিবেশে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার প্রমাণ।

তবে বিশ্বব্যাপী বাঘের অবস্থা এখনো সংকটজনক। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রায় এক লাখ বাঘ থাকলেও এখন সংখ্যাটি মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজারে নেমে এসেছে এবং এশিয়ার অনেক অঞ্চলে সংখ্যা ক্রমেই কমছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও নানা রোগের নতুন ঝুঁকি যুক্ত হয়েছে; সম্প্রতি রাশিয়ায় আফ্রিকান সোয়াইন ফিভারে বুনো শুয়োর মরে যাওয়ায় খাদ্য সংকটে অনেক বাঘ লোকালয়ে হানা দিতে বাধ্য হয়েছে। তাই ফিরে আসা বাঘগুলোর টিকে থাকার প্রধান শর্ত বনে পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এক দশক আগের তুলনায় কাজাখস্তানের ইলি-বালখাশ অভয়ারণ্য এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আলমাটি ও বালখাশ অঞ্চলজুড়ে প্রায় ৪ হাজার ১৫১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই জলাভূমিতে একসময় বড় পশুপাখি দেখা যেত না, বন ও জলাভূমি ধ্বংসের মুখে ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের পর থেকে ৫০ হেক্টরের বেশি নতুন ও পুনরুদ্ধার করা বনভূমিতে বুখারা হরিণ ও কুলানের মতো বিরল প্রাণীরা বিচরণ করছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এই বাঘ প্রকল্পের ইতিবাচক ফলাফল কয়েক বছরের মধ্যে দৃশ্যমান হবে।