বাইশ বছরের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন সংস্থায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা একজন উন্নয়নকর্মী মাহবুবা রহমান তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে প্যাকেটজাত খাদ্যের ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন। দীর্ঘদিন অপুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ে কাজ করলেও নিজের সন্তানদের খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে তিনি যে বড় ধরনের ভুল করে গেছেন, তা সম্প্রতি উপলব্ধি করেছেন।
পেশাগত ব্যস্ততা ও সন্তানদের খুশি রাখার প্রয়াসে তার পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নেয় ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চিপস, কোমল পানীয়সহ নানা প্রক্রিয়াজাত খাবার। দামী ব্র্যান্ড ও আধুনিক প্যাকেটিং দেখে সেসব খাবার নিরাপদ ও পুষ্টিকর ভাবাই ছিল তার স্বাভাবিক ভুল। তবে প্যাকেটজাত খাবারের সামনের অংশে সতর্কতামূলক লেবেল বা ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) বিষয়ক একটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে যায়।
গবেষণা ও আন্তর্জাতিক নজির পর্যালোচনা করে তিনি উদ্বেগজনক তথ্যের সম্মুখীন হন। মাত্র এক প্যাকেট চিপসেই লুকিয়ে থাকে প্রায় দু দিনের সমপরিমাণ লবণ। অন্যদিকে, একটি মাত্র ২৫০ মিলিলিটারের কোমল পানীয়ে দশ চামচ চিনি মিশে থাকে। এসব তথ্য তাকে হতচকিত করে দেয়। যে খাবারগুলো তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে ও গর্বের সঙ্গে সন্তানদের দিয়েছেন, সেগুলোকেই এখন তিনি স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের 'নীরব বিষ' হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
তিনি যুক্তি দেন, বাজারে তথ্যের তীব্র বৈষম্য বিরাজ করে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পণ্যের প্রকৃত উপাদান সম্পর্কে পুরোপুরি জানে, কিন্তু সাধারণ ক্রেতা জানেন না। এই তথ্যগত ভারসাম্যহীনতাই বিপজ্জনক খাদ্যসংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন অসংক্রামক রোগের নীরব মহামারির মুখোমুখি। দেশের অধিকাংশ মৃত্যুই আজ হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের কারণে ঘটছে। একসময় কেবল প্রবীণদের ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত এই রোগগুলো এখন তরুণ, কিশোর ও শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শৈশবের স্থূলতা এখন আর কেবল সৌন্দর্যের সংকট নয়, বরং তা ভবিষ্যতের নানা জটিলতার পূর্বাভাস।
আমরা সাধারণত চিকিৎসা নিয়ে ভাবি, অথচ রোগ প্রতিরোধের বিষয়টি উপেক্ষিতই থাকে। অথচ প্রতিরোধই অধিক কার্যকর, মানবিক ও আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী। এই বাস্তবতায় এফওপিএল কেবল একটি নীতি নয়, বরং ভোক্তার জানার মৌলিক অধিকার। প্যাকেটের সম্মুখে বড় ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা থাকলে কয়েক সেকেন্ডেই ক্রেতা বুঝতে পারবেন খাদ্যটিতে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা সম্পৃক্ত চর্বি আছে কি না। এর ফলে ভোক্তা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং একইসঙ্গে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরির চাপ সৃষ্টি হবে। ইতিমধ্যে বিশ্বের অনেক দেশেই এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। গবেষণায় প্রমাণিত, এই ধরনের স্পষ্ট সতর্কীক লেবেল মানুষকে স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নিতে ও খাদ্যশিল্পকে তাদের উপাদান পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করে।
নিজের ছোট ছেলের দিকে তাকিয়ে মাহবুবা রহমানের উপলব্ধি হয়, ভালোবাসার সুরে ও অজ্ঞতার কারণে তিনিই সন্তানকে এমন খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঠেলেছেন, যার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি ভয়াবহ। এই অনুশোচনা নিছক ব্যক্তিগত নয়, লাখো বাংলাদেশি পরিবারের বাস্তবতা। বাবা-মায়েরা সন্তানের জন্য দামি খেলনা ও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজ করেন, কিন্তু যে খাদ্য রোজ তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন সেটিই যদি ভবিষ্যতের অসুখের বীজ বুনে দেয়, তাহলে সেই ভালোবাসা অপূর্ণ থেকে যায়।
এমতাবস্থায় জোরদার নীতিগত সিদ্ধান্তের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্যাকেটজাত খাবারে এফওপিএল বাধ্যতামূলক করতে হবে, শিশুদের লক্ষ্যে তৈরি অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিভ্রান্তিকর প্রচার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে থেকে এ ধরনের খাদ্যের সহজলভ্যতা কমাতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্যখাতকে একযোগে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার সংগ্রামে শামিল হতে হবে।
একটি ছোট সতর্কতামূলক লেবেল হয়তো গোটা পৃথিবী বদলাবে না, কিন্তু একজন মাকে থমকে ভাবতে বাধ্য করতে পারে, একজন পিতাকে স্বাস্থ্যকর খাবার পছন্দ করতে উৎসাহিত করতে পারে, আর একটি শিশুকে বাঁচাতে পারে ভবিষ্যতের জটিল রোগ থেকে। এই ব্যক্তিগত অনুশোচনা থেকে আগামী প্রজন্মের কোনো মা যেন একই কষ্ট না ভোগেন, সেই প্রত্যয়ই এখন সচেতনতার আন্দোলনের মূল বার্তা।




