রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিগত কয়েকদিন ধরে তীব্র গ্যাস-সংকট চলছে। অনেক বাসাবাড়িতে রান্নার চুলা প্রায় জ্বলছেই না। এ অবস্থায় মানুষ রেস্তোরাঁর খাবারের পাশাপাশি বিকল্প রান্নার মাধ্যম হিসেবে ঝুঁকছেন বৈদ্যুতিক চুলার দিকে। হুট করেই বাজারে এর চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। মিরপুরের ১০ নম্বর সেক্টরের শাহ্ আলী প্লাজার একাধিক ধরনের চুলা বিক্রেতা মো. শামীম জানালেন, ‘আগে ১০ দোকানে যেখানে দৈনিক ১০টি চুলা বিক্রি হতো, বর্তমানে ৫০টিও বিক্রি হচ্ছে। এখন ঘরে ঘরে এই চুলা। কারণ খেয়ে বাঁচতেই হবে।’ তবে শুধু দাম বিবেচনা করে একটি চুলা কিনলেই চলবে না। বাজারে ক্রেতাদের জন্য বৈদ্যুতিক চুলার প্রকৃতি, রন্ধনের গতি, সুরক্ষা ও বিদ্যুতের ব্যবহার—এসব বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।

বর্তমান বাজারে প্রধানত দুই রকম বৈদ্যুতিক চুলা পাওয়া যায়: ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড। ইন্ডাকশন চুলার কাজ করার পদ্ধতি ভিন্ন। এটি তড়িৎ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্র উৎপন্ন করে সরাসরি পাত্রকে উত্তপ্ত করে। এই চুলার জন্য নির্দিষ্ট পাত্র অপরিহার্য। কেবল সেই ধাতুর তৈরি বাসনই ব্যবহার করা যায়, যা চুম্বকীয় বল দ্বারা আকর্ষিত হয়। অপরদিকে ইনফ্রারেড চুলার কাঁচের তলার নিচে একটি তাপ প্রদানকারী অংশ থাকে, যেমন হ্যালোজেন বা নিক্রোম কয়েল। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে উপাদানটি গরম হয় এবং ইনফ্রারেড রশ্মি ও তাপ বিকিরণ করে। এই তাপে প্রথমে কাঁচ ও পরে পাত্র গরম হয়। এই চুলায় যেকোনো সাধারণ রান্নার বাসন ব্যবহার করা যায়। আলাদা কোন পাত্র কেনার দরকার পড়ে না।

উভয় চুলার কার্যপদ্ধতিগত একটি মৌলিক তফাত বিদ্যমান। ইন্ডাকশন চুলা শুধু রান্নার বাসনটিকেই গরম করে, কিন্তু ইনফ্রারেড চুলার পুরো উপরিভাগ গরম হয়ে ওঠে এবং রান্নার শেষে এটি স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আসতে প্রায় ২০ মিনিট সময় নেয়। রান্নার গতির ক্ষেত্রেও পার্থক্য আছে। ইন্ডাকশন চুলায় পাত্র অতিদ্রুত উত্তপ্ত হয়, ফলে রান্নায় সময় কম লাগে। তুলনামূলকভাবে, ইনফ্রারেড প্রযুক্তির চুলায় রান্নার গতি মন্থর। বিদ্যুৎ খরচের বিচারেও ইন্ডাকশন এগিয়ে; এটি ইনফ্রারেড চুলার তুলনায় কম বিদ্যুৎ খরচ করে থাকে।

মূল্যের প্রসঙ্গে জানা যায়, বাজারচলতি বেশির ভাগ বৈদ্যুতিক চুলা একক বার্নারের। এই শ্রেণির চুলা ৪ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকার মধ্যে কেনা সম্ভব। যদিও কিছু ‘ডাবল বার্নার’ মডেলও বাজারে বিদ্যমান। এই চুলাগুলোতে একটি ইন্ডাকশন ও অপরটি ইনফ্রারেড বার্নার যুক্ত থাকে। দুই বার্নার বিশিষ্ট চুলাগুলো ৭ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকা দামে পাওয়া যায়। তবে ডাবল বার্নার চুলা বসানোর আগে বাড়ির বিদ্যুতের মূল সংযোগ লাইন যন্ত্রটির চাপ সহায়ে সক্ষম কিনা তা নিশ্চিত করে নেওয়া দরকার।

ব্যবহারে যত্ন নিলে একটি বৈদ্যুতিক চুলা প্রায় ৮ থেকে ৯ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে ইনফ্রারেড চুলার ওপরের কাচের অংশ দুই-তিন বছরের ভেতর নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাজারে সাধারণত চুলার এসব যন্ত্রাংশ আলাদা পাওয়া যায় না, তাই ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া জরুরি। চুলা ব্যবহারের সময় কাচের ওপরে রান্নার পানি পড়ে গেলে চুলা বন্ধ করে শুষ্ক কাপড়ে সেটি মুছে ফেলতে হবে। বিশেষ করে ইনফ্রারেড চুলা সম্পূর্ণ ঠান্ডা হওয়ার পরই পরিষ্কার করা উচিত। এছাড়া ছোট বাচ্চাদের এই চুলার ধার থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। একটানা সাড়ে তিন ঘণ্টা ব্যবহারের পর ৩০ মিনিটের একটি বিরতি দেওয়া বাঞ্ছনীয়। আর প্রত্যেক দুই সপ্তাহ অন্তর একবার চুলার অভ্যন্তরীণ কুলিং ফ্যান পরিষ্কার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।