প্লাস্টিক এক ধরনের অজৈব পদার্থ, যা প্রাকৃতিক নিয়মে সহজে মিশে যায় না। পরিবেশে এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থেকে ক্রমাগত ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর কণায় বিভক্ত হয়, যেগুলো মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত। এই অতিক্ষুদ্র দূষণবাহক এখন মাটি, নদী ও মহাসাগরে জমা হওয়ার পাশাপাশি পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়েছে। ফলে প্রতিদিনের খাবার হিসেবে আমরা যে মাছ, মাংস, কৃষিজাত ফসল কিংবা সামুদ্রিক খাবার খাই, তার মধ্য দিয়ে অসাবধানতাবশত মাইক্রোপ্লাস্টিক দেহে প্রবেশ করছি।
স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়টি ব্যাপক। প্লাস্টিকের কণা যখন ন্যানো আকারে পৌঁছায়, তখন তা খাদ্য ও পানির সাথে মিশে অথবা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুস হয়ে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। এই ক্ষুদ্র কণাগুলো দেহের অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। নারীরদের বেলায় এটি জরায়ুর ফাইব্রয়েড, এন্ডোমেট্রিওসিস এবং প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোমের মতো সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, পুরুষদের প্রজননক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে, শুক্রাণুর গুণমান ও টেস্টোস্টেরনের উৎপাদন হ্রাস করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি সময়ের আগেই বয়ঃসন্ধি ঘটিয়ে দিতে অথবা বয়ঃসন্ধির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে দেরি করে দিতে পারে, যা তাদের সার্বিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাছাড়া, ফুসফুস, স্তন, প্রোস্টেট ও যকৃতের ক্যানসারের মতো ম্যালিগন্যান্ট রোগের সঙ্গেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। এমনকি অগ্ন্যাশয়ের কর্কট রাশি ও পিত্তনালির ক্যানসারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি করে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক দণা।
শুধু তা-ই নয়, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমও এর আক্রান্ত হয়। ক্ষুদ্র কণাগুলো অ্যন্ত্রের প্রাচীরে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা থেকে একদিকে যেমন খাদ্য সংবেদনশীলতা দেখা দিতে পারে, তেমনি অটোইমিউন ডিজিজ ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির মতো জটিল সমস্যারও সূত্রপাত হয়।
এসব বিপদ এড়াতে পুষ্টিবিদ লিনা আকতার দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, রান্নাঘরে প্লাস্টিকের চপিং বোর্ড পরিত্যাগ করে কাঠের বা শক্ত কাচের বোর্ড ব্যবহার করা জরুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পাত্র হিসেবে স্টেইনলেস স্টিল, ফুড গ্রেডের সিলিকন বা কাঠের বিকল্প বাছাই করতে হবে। পানীয়ের জন্য প্লাস্টিকের তৃণ পরিবর্তে বাঁশের বা স্টেইনলেস স্টিলের স্ট্র গ্রহণ করা উচিত। খাদ্যের সংস্পর্শে আসে এমন কোনো প্লাস্টিকের সামগ্রী কেনার আগে তাতে 'বিপিএ' রাসায়নিকের উপস্থিতি আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। মাইক্রওয়েভ ওভেনে খাবার গরম করার সময় প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করা চলবে না। অনেক টি-ব্যাগে পলিপ্রোপিলিন নামক এক প্রকার প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়, তাই প্যাকেটজাত চায়ের বদলে খোলা চা-পাতা ও ছাঁকনি ব্যবহার করাই নিরাপদ। দাঁত পরিষ্কারের জন্যও প্লাস্টিকের ব্রাশ ফেলে বাঁশের নির্মিত টুথব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন। দৈনন্দিন বাজার-সদাই থেকে শুরু করে পানি পান: জন্য সবখানেই পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছেন লিনা আকতার, যেমন পাটের ব্যাগে বাজার করা এবং প্লাস্টিকের বোতল এড়িয়ে স্টেইনলেস স্টিল বা তাপ নিরোধক বোতল ব্যবহার করা।
শিশুদের জন্যও বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন পুষ্টিবিদ। তাদের জন্য প্লাস্টিকের টিফিন বক্স বাদ দিয়ে স্টিলের বাক্স দেওয়ার কথা বলছেন তিনি। কৃত্রিম তন্তু নয়, সুতির কাপড় পরানোকে স্বাস্থ্যসম্মত বলে মত দিয়েছেন। খেলনার ক্ষেত্রেও প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাঠ, তুলা, সিলিকন বা রাবার নির্মিত নিরাপদ খেলনা বাছাইয়ের কথা বলা হয়েছে।
পুষ্টিবিদ লিনা আকতার আরও জানান, খাদ্যতালিকায় কিছু উপাদান অন্তর্ভুক্ত করে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব কিছুটা প্রতিরোধ করা যেতে পারে। নীল, বেগুনি ও লাল রঙের ফল ও সবজিতে বিদ্যমান 'অ্যান্থোসায়ানিন' নামক উপাদান এই কাজে সাহায্য করে। তাই নিয়মিত খাদ্য তালিকায় ডালিম, ড্রাগন ফল, বীট, গাজর, স্ট্রবেরি, চেরি, ব্লুেমারি ও লাল পেঁয়াজ রাখতে হবে। লিনা আকতার রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুরে কর্মরত আছেন।




