রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন একটি সহজ মাধ্যম হয়ে উঠলেও, এর মাধ্যমে অর্জিত পরিবর্তনকে দীর্ঘস্থায়ী করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ফাহমিদুল হক। তাঁর মতে, এই মাধ্যমগুলো তরুণদের মধ্যে আবেগ ও ক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হলেও, প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্থায়িত্ব নির্ভর করে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার উপর।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব) ক্যাম্পাসে ‘ফ্রম ডিজিটাল স্ক্রিন টু স্ট্রিট: সাউথ এশিয়াস জেন-জি আপরাইজিং’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ-সংক্রান্ত গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের ফ্যাকাল্টি মেম্বার ফাহমিদুল হক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম ও সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ (সিএসএএস) যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে, যাতে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা।

গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্বের অন্তত ১১টি দেশে জেন-জি তরুণদের নেতৃত্বে বড় ধরনের আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। মাদাগাস্কার, ফিলিপাইন, মরক্কো, নেপাল, তানজানিয়া, পেরু, প্যারাগুয়ে, মালদ্বীপ ও কেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এসব আন্দোলন সরকারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এই আন্দোলনগুলোর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে—এগুলো অনেকাংশে স্বতঃস্ফূর্ত, আদর্শগতভাবে খুব একটা সুস্পষ্ট নয়, তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং মূলত অহিংস পদ্ধতির। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে তরুণদের প্রতিনিধিত্বের অভাব এই আন্দোলনগুলোর পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন তিনি। বিভিন্ন দেশের তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ থাকায় এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের তরুণদের মনে প্রভাব ফেলছে বলেও উল্লেখ করেন এই অধ্যাপক।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর একটি বিপজ্জনক দিক চোখ এড়িয়ে যায় বলেও সতর্ক করেন ফাহমিদুল হক। একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যেমন আন্দোলন ও জনমত গঠন সম্ভব, তেমনি জনতাকে সংগঠিত করে কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হামলাও চালানো যেতে পারে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে হামলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে প্রথমে একটি নির্দিষ্ট বয়ান ও আবেগের পক্ষে ঐকমত্য তৈরি হয় এবং পরে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেই জনতাকে বাস্তব কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়। অর্থাৎ ‘কনসেনসাস মোবিলাইজেশন’ থেকে ‘অ্যাকশন মোবিলাইজেশনে’ যাওয়ার পথে সামাজিক মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রসঙ্গে ফাহমিদুল হক উল্লেখ করেন, শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এবং উদীচী ও ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে জনতাকে সংগঠিত করার বিষয়টি লক্ষণীয়। তাঁর মতে, এই ধরনের ঘটনায় প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমও ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ তারা বেশি এনগেজমেন্ট তৈরি করে এমন কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে দেয় এবং সেখানে কনটেন্টের ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব সব সময় বিবেচনায় আনা হয় না। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারে হামলার আগে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে হুমকি ও সহিংসতার ডাক ছড়িয়ে পড়েছিল, যা পরে দ্য ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে।

জেন-জি তরুণেরা আদর্শের চেয়ে অভিন্ন আবেগ ও অনুভূতিতে বেশি উদ্বুদ্ধ হন বলে মনে করেন ফাহমিদুল হক। সামাজিক মাধ্যম সেই আবেগ দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে সংগঠিত করে এবং প্রথমে ঐকমত্য তৈরি হওয়ার পর মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে; ইন্টারনেট বন্ধের সময় ভিপিএন এবং নিরাপত্তার কারণে বাটন ফোনের ব্যবহারও দেখা গেছে। এই আন্দোলনকে শুধু ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আগে ও পরের ঘটনাও এর অংশ হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন তিনি। আন্দোলনের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের পোস্টে আবেগঘন ভাষায় মানুষকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হতো, পরে সেই বক্তব্যে শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও নাগরিক দায়িত্বের বিষয় প্রাধান্য পায়।

নেপালের আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়েও বেশি সামাজিক মাধ্যমনির্ভর ছিল বলে জানান ফাহমিদুল হক। সেখানে সামাজিক মাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্ত ছিল তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল বেকারত্ব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতি ক্ষোভ। মূল প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তরুণেরা গেমিং প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ড ব্যবহার করে আন্দোলন সমন্বয় করেন এবং পরে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানেও সামাজিক মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই মাধ্যমের ব্যবহার সব সময় ইতিবাচক নয় বলেও সতর্ক করেন তিনি। অনলাইনে ঐকমত্য তৈরি হওয়ার পর বিকল্প প্ল্যাটফর্মে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে তা বাস্তব সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। তিনি মনে করেন, সামাজিক মাধ্যম পরিবর্তন আনা সহজ করলেও তা টেকসই করা কঠিন; আন্দোলনের পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, টেকসই অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম প্রয়োজন এবং অস্থিতিশীলতা ও অপূর্ণ প্রত্যাশা থেকে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানও সম্ভব।