উত্তর-পূর্ব আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে চলা শত শত বাণিজ্যিক ফ্লাইটের আকাশপথ পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হবে আগামী দুই শীত মৌসুমে। এই ক্ষুদ্র উচ্চতা সমন্বয়ের মাধ্যমে বিমান চলাচলের জলবায়ু প্রভাব কমানো সম্ভব কি না, তা যাচাইয়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক কর্মসূচি শুরু করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে কনডেনসেশন ট্রেইল বা কনট্রেইল এড়াতে বিমানের পথ পরিবর্তনের কৌশল যাচাই করা হবে।

ঠান্ডা ও আর্দ্র অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বিমান ওড়ার সময় ইঞ্জিন থেকে নির্গত কালি কণার চারপাশে বরফের স্ফটিক তৈরি হতে পারে। ফলে যে মেঘের সৃষ্টি হয়, তা তাপ আটকে রেখে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এই কনট্রেইলগুলোর কারণেই বিমান চলাচলের জলবায়ু প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঘটে থাকে।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে বিমান চলাচলের অন্যতম ব্যস্ত গেটওয়ে হিসেবে পরিচিত শ্যানউইক ওশেনিক কন্ট্রোল এরিয়া — উত্তর আটলান্টিক করিডরের পূর্বাঞ্চল — এই পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। একই সঙ্গে কনট্রেইল তৈরির জন্য এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা। 'অপারেশন ব্লু স্কাইজ' নামের এই ৩০ মাসের গবেষণা কর্মসূচির আওতায় এই শীতে ও আগামী শীতে পরীক্ষামূলক সময় থাকবে। তখন বিমান নিয়ন্ত্রকরা কিছু ফ্লাইটকে ২,০০০ ফুট (৬১০ মিটার) পর্যন্ত উচ্চতা পরিবর্তনের নির্দেশ দেবেন, যাতে কনট্রেইল তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে এমন অঞ্চল এড়িয়ে যাওয়া যায়।

যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, এই উচ্চতা সমন্বয়গুলো হবে মানসম্মত ফ্লাইট পরিচালনার মধ্যে সামান্য পরিবর্তন, যা প্রতিষ্ঠিত বিমান যোগাযোগ চ্যানেলের মাধ্যমে সমন্বয় করা হবে। প্রতি শীতে প্রায় ২০ থেকে ৪০ দিন পরীক্ষা চালানো হবে, যখন বিমান চলাচল তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এই সময়ে শ্যানউইক আকাশসীমা দিয়ে প্রায় ১০,০০০ ফ্লাইট যাতায়াত করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার মধ্যে শত শত ফ্লাইটের পথ পরিবর্তন করা হতে পারে।

গুগলের 'অপারেশন ব্লু স্কাইজ' প্রকল্পের প্রযুক্তি প্রধান পল হজসন জানিয়েছেন, মাত্র ১ থেকে ৫ শতাংশ ফ্লাইটের পথ পরিবর্তন করলেই পুরো আকাশসীমায় কনট্রেইল গঠন হ্রাসের একটি পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যাবে। এর আগে পৃথক বিমান সংস্থাগুলো কনট্রেইল এড়াতে উচ্চতা পরিবর্তনের পরীক্ষা চালিয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে গুগল ও আমেরিকান এয়ারলাইনস জানিয়েছিল, তাদের এআই-ভিত্তিক পূর্বাভাস সরঞ্জাম ব্যবহার করে কিছু ফ্লাইটের জলবায়ু প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই নতুন উদ্যোগটি পৃথক এয়ারলাইনের পরীক্ষার বাইরে গিয়ে একটি সম্পূর্ণ ফ্লাইট করিডোরে কনট্রেইল কমানোর চেষ্টা করছে।

বিমানের পেছনে তৈরি হওয়া এই পাতলা সাদা রেখাগুলো পৃথিবীর উষ্ণায়নে বিস্ময়করভাবে বড় ভূমিকা রাখে। বিল গেটসের ব্রেকথ্রু এনার্জি গ্রুপের অংশ কনট্রেইলস ডট ওআরজি নামের অলাভজনক গবেষণা সংস্থার মতে, এগুলোর কারণে পৃথিবীর উষ্ণায়নের ১ থেকে ২ শতাংশ ঘটে থাকে। মডেলিংয়ের মাধ্যমে দেখা গেছে, শ্যানউইক আকাশসীমা মোট কনট্রেইলের প্রায় ৫ শতাংশের জন্য দায়ী, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঘটে শীতকালে।

যুক্তরাজ্যের বিমান চলাচলবিষয়ক মন্ত্রী কিয়ার মাদার বলেছেন, বিমান চলাচলকে আরও পরিবেশবান্ধব করার কার্যকর উপায় খুঁজতে ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞ ও উদ্ভাবকদের সহায়তায় গুগলের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে সরকার। এই গবেষণার মোট ব্যয় ৫ মিলিয়ন পাউন্ড (৬.৭৬ মিলিয়ন ডলার), যার অর্ধেকের বেশি অর্থ দিচ্ছে সরকার। গুগল বলেছে, বিমান চলাচলের জন্য কনট্রেইল আজ সবচেয়ে জরুরি কিন্তু সমাধানযোগ্য জলবায়ু চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

পুরো আকাশসীমায় পরীক্ষা চালানোর মাধ্যমে একাধিক বিমানকে একই সঙ্গে কনট্রেইল তৈরির এলাকা থেকে সরানো সম্ভব কি না, এবং একটি অঞ্চলের জন্য সামগ্রিকভাবে কনট্রেইল কমানো যায় কি না — তা দেখা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন হজসন। তার মতে, এটি অন্যান্য আকাশসীমার জন্যও একটি নকশা বা ব্লুপ্রিন্ট সরবরাহ করতে পারে। গুগল ও যুক্তরাজ্যের পরিবহন বিভাগের পাশাপাশি এই প্রকল্পে অংশ নিয়েছে মেট অফিস, যুক্তরাজ্যের শীর্ষ বিমান নেভিগেশন পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা ন্যাটস, কনট্রেইলস ডট ওআরজি, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২০ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্লাইট পথে সামান্য পরিবর্তন আনলে কনট্রেইলের জলবায়ু প্রভাব কমানো সম্ভব। অধ্যাপক মার্ক স্টেটলার বলেছেন, অভূতপূর্ব মাপের এই পরীক্ষার মাধ্যমে বাস্তব জগতে সেই ধারণা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হলো 'অপারেশন ব্লু স্কাইজে'।