চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায়, ভূমি থেকে প্রায় এক হাজার দুইশ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোমুগ্ধকর। পূর্বদিকে ছোট ও বড় পাহাড় এবং উপত্যকা সবুজে মোড়া। পশ্চিমে সন্দ্বীপ চ্যানেল ও সন্দ্বীপের দৃশ্য চোখে পড়ে। মন্দির থেকে ঠিক নিচের দিকে তাকালে বিরূপাক্ষ মন্দির, স্বয়ম্ভূনাথ মন্দির ও বিশ্বনাথ মন্দির দেখা যায়। কোথাও কোথাও মেঘ পাহাড়ের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এই মনোরম পরিবেশের মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে দুটি বানর।
মন্দিরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ পাল প্রথম আলোকে জানান, বানর দুটি বহুদিন ধরেই মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থান করছে। প্রতিদিন তীর্থযাত্রীদের হাত থেকে পূজার ফল পেয়ে থাকে। আশপাশের বাগানে খাদ্যের অভাব দেখা দিলে এরা মন্দিরের কাছাকাছি থাকতে শুরু করে। কোনো তীর্থযাত্রীকে অকারণে বিরক্ত করে না। তবে ভয় দেখালে বা খাবার ছাড়া ছবি তুলতে চাইলে রাগ প্রকাশ করে।
গত শনিবার দুপুরে মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক তীর্থযাত্রী পূজা শেষে সেখানে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে অনেকে বানর দুটিকে বিভিন্ন রকমের ফল খেতে দেন। বানরগুলো খুব কাছে এসে হাত থেকে ফল নেয়। এরপর মন্দিরের ছাদে অথবা পাশের গাছে বসে খেয়ে নেয়। আবার অপেক্ষায় থাকে। অনেকে তাদের সঙ্গে ছবি তুলতে চান। কিন্তু মুঠোফোন বের করলে বানরগুলো নিজে থেকেই কাছে আসে। ছবি তোলার পর যদি ফল বা অন্য কোনো খাবার না দেওয়া হয়, তবে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এমনকি আক্রমণের আশঙ্কাও তৈরি হয়। পুরো মন্দির প্রাঙ্গণে এরা ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ভেতরে প্রবেশ করে না।
রূপনা দাস নামের এক তীর্থযাত্রী জানান, তার হাত থেকে আপেল নেওয়া বানরটি খুব কাছে বসে ছিল। তিনি ভয়ে ভয়ে আরও কাছে গিয়ে ছবি তুলতে যান। বানরটি চুপচাপ বসে ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে এক তীর্থযাত্রী ছবি তুলতে গেলে তাকে ভয় দেখিয়েছিল। কারণ সেই ব্যক্তি কোনো খাবার দেননি। তাই বানরটি তাকে হুমকি দেখিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, মূলত খাবারের বিনিময়ে এরা ছবি তোলার সুযোগ দেয়।
মন্দিরের পূজারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে অনেকগুলো বানর দলবেঁধে মন্দির এলাকায় আসে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে যখন খাদ্যের সংকট তীব্র হয়, তখন এদের উপস্থিতি আরও বাড়ে। তবে দুটি বানর সবসময়ই এখানে থাকে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চন্দ্রনাথ পাহাড়ের আশপাশের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় গভীর বন রয়েছে। এখানে বাঁশ, কলাসহ নানা ধরনের লতাগুল্ম জন্মে। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশে নানা প্রজাতির পাখি, বানর, বন্য শূকর, হরিণ, অজগর, সাপসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণী বসবাস করে। এর মধ্যে কেবল বানরই মানুষের কাছাকাছি আসে। পাহাড়ের নানা অংশে গড়ে ওঠা চা-দোকানের আশপাশেও এদের দেখা মেলে।
বনের বানর মানুষের কাছে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। তীর্থযাত্রীরাও ভালোবেসে তাদের খাবার দেন। মন্দিরের ছাদে দেখা মিলেছে দুই বানরের একটির। এরা পুরো মন্দির প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ভেতরে প্রবেশ করে না। খাবারের সংকট ও মানুষের সঙ্গে এই অদ্ভুত সম্পর্কই চন্দ্রনাথ মন্দিরের বানরদের আচরণের মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




