সম্প্রতি বিশ্বের অতি-ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন এক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তারা ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নিজেদের সম্পদ স্থানান্তরের কথা ভাবছেন। সিটি ওয়েলথের বৈশ্বিক ক্লায়েন্ট সলিউশন বিভাগের প্রধান ডার্লিন প্যাটারসন সম্প্রতি ফরচুনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, তার পেশাগত জীবনে এই প্রথম তিনি মার্কিন গ্রাহকদের কাছ থেকে এমন আগ্রহ দেখতে পাচ্ছেন। তিনি বলেন, গ্রাহকরা পুরোপুরি দেশ ত্যাগ করছেন না বরং ‘বিকল্প সুযোগ’ খুঁজছেন। তারা ইতালি, পর্তুগাল, জার্সি (চ্যানেল আইল্যান্ডস), অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে দ্বিতীয় নাগরিকত্ব বা গোল্ডেন ভিসা নিচ্ছেন। প্যাটারসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগই এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি বলেন, গ্রাহকরা একটি স্থিতিশীল ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক পরিবেশ কামনা করেন।
প্যাটারসন এই বিষয়ে একা নন। অ্যাপেক্স ক্যাপিটাল পার্টনার্সের নুরি কাটজ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অতি-ধনীদের স্থানান্তরে সহায়তা করছেন, তিনিও একই কথা বলেছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি ফরচুনকে জানান, মার্কিন নাগরিকরা এখন তার সবচেয়ে বড় বর্ধনশীল গ্রাহক গোষ্ঠী। তিনিও তার ক্যারিয়ারে এই প্রথম এমন প্রবণতা দেখছেন।
সিটি ওয়েলথের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ‘ওয়েলথ বিয়ন্ড বর্ডারস’ এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভৌগোলিক অবস্থান এখন শুধু সম্পদ বরাদ্দের অংশ নয়, বরং পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণের একটি উদীয়মান স্তম্ভ। বিসিজির ২০২৫ সালের বৈশ্বিক সম্পদ প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে মোট ৩ দশমিক ০৬ ট্রিলিয়ন ডলার পাঁচটি প্রধান আর্থিক কেন্দ্রে—হংকং, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র—স্থানান্তরিত হবে। এশিয়া এই প্রবাহে নেতৃত্ব দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদনের মতে, এই সম্পদ গতিশীলতার পেছনে তিনটি কারণ কাজ করছে: পারিবারিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, ব্যবসা ও পোর্টফোলিও প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং নীতি বা সার্বভৌম ঝুঁকির বিরুদ্ধে সম্পদের সক্ষমতা বাড়ানো।
শুধু ব্যক্তিগত গ্রাহকই নন, ফ্যামিলি অফিসগুলোও একই পথে হাঁটছে। সিটির এক আলাদা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উত্তর ও লাতিন আমেরিকা জুড়ে প্রায় ২ হাজার ফ্যামিলি অফিসের গড় সম্পদ ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সিটির ফ্যামিলি অফিস ব্যবসার প্রধান রিচার্ড ওয়েনট্রাব জানান, নতুন প্রজন্মের বিলিয়নিয়াররা এখন জন্মসূত্রেই তাদের সম্পদ আন্তর্জাতিকভাবে বিনিয়োগের অনুরোধ জানাচ্ছেন। তারা জিজ্ঞাসা করছেন, সুইজারল্যান্ডে অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে কি না, সিঙ্গাপুরে সম্পদ বুক করা যাবে কি না। উভয় নির্বাহী জানিয়েছেন, এটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়। প্যাটারসনের ভাষায়, ‘গ্রাহকদের মধ্যে আমরা যা দেখছি, তা খুবই পরিকল্পিত।’ সিটির প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, কৌশলগত সম্পদ ব্যবস্থাপনা এখন শুধু প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নয়, বরং সম্পদের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি সক্রিয় কৌশল।
তবে সবাই একমত যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্পদ কেন্দ্র। দেশটির নিয়ম-কানুন ও পুঁজিবাজার এখনো আকর্ষণীয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিনিয়োগকারীরাও সম্প্রতি ইরান সংঘাতের পর আবার যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু সামগ্রিক প্রবণতা হলো, অতি-ধনীরা এখন আর সব সম্পদ এক দেশে রাখতে চান না। তারা বিশ্বব্যাপী সম্পদ ছড়িয়ে দিচ্ছেন—ঝুঁকি কমাতে এবং নতুন সুযোগ খুঁজতে।




