চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে প্রারম্ভিক আলোচনার জন্য ঢাকায় পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি উচ্চপর্যায়ের ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদল। এই মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আইএমএফের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের ডেপুটি ডিভিশনের প্রধান ইভো ক্রজনার।

আগামীকাল রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে এই আলোচনা। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করবেন আইএমএফ প্রতিনিধিরা। সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথেও বৈঠকের কথা রয়েছে তাদের। সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতনকাঠামো নিয়েও পৃথকভাবে মূল্যায়ন করবে সংস্থাটি।

বাংলাদেশ সরকার নতুন কর্মসূচির আওতায় তিন বছরের জন্য ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার আশা করছে। এই অর্থ সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ সামলানো এবং অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে গত ৯ জুন আইএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, আগের ঋণ কর্মসূচি গ্রহণের সময়ের অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপট এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিবর্তন, বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তা ও নতুন অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কিছু সংস্কার নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষ সংস্কার পথ থেকে সরে আসছে না, বরং দেশীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী।

আলোচনায় অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই উঠে আসবে। সদ্য ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন করছাড়ের যৌক্তিকতা, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংস্কারের অগ্রগতি এবং কর–ব্যয় সংস্কারের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। ব্যাংক খাত থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সুশাসন জোরদার, খেলাপি ঋণ হ্রাসের কৌশল, ব্যাংক পুনর্গঠন ও অবসায়নে অর্থায়নের ব্যবস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে আইএমএফ।

পাশাপাশি রাজস্ব আদায় কম হওয়া ও সরকারি ঋণ বৃদ্ধির কারণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, বিদ্যুতের দাম সমন্বয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে সরকারি ব্যয় নিয়েও বিশদ আলোচনা হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবতা, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থ ব্যয়ের দক্ষতা সম্পর্কেও জানতে চাইবে সংস্থাটি।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন–ভাতা নিয়ে পৃথক মূল্যায়ন করা হবে। বর্তমানে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা, নতুন নিয়োগের পরিকল্পনা, বিদ্যমান বেতনকাঠামো, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির নীতি ও বিভিন্ন ভাতার আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবে আইএমএফ।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পৃথক পর্যালোচনায় ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি আমদানি ব্যয়, বিদ্যুতের দাম সমন্বয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করা হবে। প্রাকৃতিক গ্যাসে ভর্তুকি, পেট্রোবাংলাকে দেওয়া সরকারি সহায়তা ও পুরো জ্বালানি খাতের আর্থিক প্রবাহও থাকবে পর্যালোচনায়।

সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হবে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিকল্পনা, সরকারি গ্যারান্টি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দায়, বৈদেশিক ঋণের কাঠামো, ভবিষ্যৎ ঋণ ছাড়ের সময়সূচি, পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা ও স্বল্প সুদের উন্নয়ন ঋণ এবং বাণিজ্যিক ঋণের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করবে আইএমএফ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব বৈঠকের মাধ্যমে নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য শর্ত ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে সরকার তার সাম্প্রতিক অগ্রগতি তুলে ধরবে। এর মধ্যে রয়েছে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা, মুদ্রানীতির আধুনিকায়ন, ব্যাংক রেজোলিউশন ও আমানত সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, ঝুঁকিভিত্তিক ব্যাংক তদারকি, জলবায়ু সংস্কার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের উদ্যোগ।

ঢাকা সফর শেষে আইএমএফ প্রতিনিধিদল ওয়াশিংটনে সদর দপ্তরে তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে আগামী অক্টোবরে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে আরেকটি মিশন ঢাকায় আসতে পারে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এর আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ ছাড় হয়নি। তার পরিপ্রেক্ষিতেই নতুন কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে উভয় পক্ষ।