মহামারি-উত্তর পৃথিবী যখন আবার খুলল, তখন পশ্চিমা গাড়ি নির্মাতাদের নির্বাহীরা জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি খেলেন। এই সময়ে চীন কেবল তাল মিলিয়ে চলেনি, বরং একটি বিরাট লাফ দিয়েছিল। বর্তমান চিত্রে গাড়ি বিক্রি কমছে, শুল্কের বাড়তি খরচ পীড়াদায়ক হয়ে উঠছে এবং যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু যে বিষয়টি সত্যিই কর্ণধারীদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, তা হলো চীন।

গত দুই দশকে ডেট্রয়েটের ‘বিগ থ্রি’ গাড়ি কোম্পানি বিশ্ব বাজারে তাদের অংশীদারি ১৬ পয়েন্ট হারিয়েছে, যেন প্রতি বছরই এক পয়েন্ট করে কমছে। একই সময়ে, চীনা গাড়ি নির্মুলাদের বৈশ্বিক অংশীদারি ১ শতাংশেরও কম থেকে বেড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। পশ্চিমা নির্মুলারা একবিারে চীনে যে মুনাফা করতো, তা ক্রমশ বিলীন হচ্ছে, কারণ চীনা কোম্পানিগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজারের দখল নেয়ার পাশাপাশি বিশ্বের অন্য সব জায়গায় আগ্রাসী সম্প্রসারণ করছে। তাদের অগ্রযাত্রা এখন ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকা জুড়ে। যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র বড় বাজার যেখানে এখনো চীনা মডেলগুলি প্রবেশ করতে পারেনি— কিন্তু বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা চিরদিন টিকবে না। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে, শুধু জার্মানিতে বিওয়াইডি-র এখন প্রায় ২০০টি বিক্রয় আউটলেট আছে। এটি আর দূরের কোনও হুঁশিয়ারি নয়; এটি ইতিমধ্যেই সেই সব বাজারকে পুনর্গঠন করছে যেগুলোকে পশ্চিমা কোম্পানিগুলো কখনও নিজেদের নিরাপদ আবাসভূমি মনে করতো।

ম্যাককিনসির সদ্য প্রকাশিত 'মোবিলিটি কনজ্যুমার পালস' জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শুল্ক-চালিত মূল্যবৃদ্ধির দায়ে মার্কিন ক্রেতারা হয় ছোট গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন, নয়তো বর্তমান গাড়িটি বেশিদিন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। পশ্চিমা নির্মুলাদের জন্য এটি একটি বিপজ্জনক চাহিদা সংকেত, বিশেষ করে যখন আরও সাশ্রয়ী প্রতিযোগী গাড়ি বাজারে আসতে এখনও কমপক্ষে এক বছর বাকি।

কয়েক দশক ধরে চীনা গাড়ি নির্মুলারা তাদের পশ্চিমা যৌথ-উদ্যোগের অংশীদারদের কাছে থেকে শিখেছে। চীনা সরকার বৈদ্যুতিক যানের জন্য বিশ বর্ষী একটি মহাপরিকল্পনা নিয়েছিল এবং তা অসাধারণ শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের সাথে বাস্তবায়ন করে। পৃথিবী যখন পুনরায় খুলল, পশ্চিমা নির্বাহীরা অনেক দেরিতে উপলব্ধি করলেন কী ঘটে গেছে: প্রযুক্তি ও কার্যদক্ষতায় চীন বহু এগিয়ে গেছে। চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীরা মাত্র ২০ থেকে ২৪ মাসের বিকাশ চক্রে নতুন মডেল বাজারে আনছে, যেখানে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর লাগে ৪০ থেকে ৫০ মাস। তার মানে, পরিণত প্রযুক্তি দ্রুততর সময়ে শোরুমে পৌঁছাচ্ছে। এছাড়া তারা ৩০ শতাংশ কম উপকরণ-বিল খরচ এবং ৩০ শতাংশ কম মূলধন ব্যয়ে গাড়ি উৎপাদন করছে। এবং সবচেয়ে কর্ণকঠ অংশটি হলো: আপনি যে গাড়িটির সাথে লড়ছেন, তা কেবল সস্তাই নয়; বরং অনেক উন্নতও।

সফটওয়্যার, সংযোগ, স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং বৈশিষ্ট্য এবং রেঞ্জের দিক থেকে চীনা গাড়িগুলো পশ্চিমা সমকক্ষদের চেয়ে প্রায়শই উন্নত। শুধু দামের ভিত্তিতে চীনা নির্মুলারা প্রতিযোগিতা করে, এই ধারণাটা আর সঠিক নয়। আমাদের জরিপ নিশ্চিত করেছে, প্রজন্ম ও মিলেনিয়াল গাড়ি ক্রেতারা বয়স্কদের তুলনায় চীনা ইভি কেনার প্রতি উল্লেখযোগ্যভাবে অধিক আগ্রহী এবং উন্নত চালক-সহায়তা প্রযুক্তির জন্য তারা তুলনামূলক সহজেই পুরনো ব্র্যান্ড বদলাতে প্রস্তুত। পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো যে অনুগতির ওপর দীর্ঘদিন নির্ভর করে আসছে, তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিশ্চিত নয়।

বর্তমান ধারা যদি অব্যাহত থাকে, পশ্চিমা নির্মুলাদের জন্য খেলা শেষ হয়ে যাবে। পদক্ষেপ নেওয়ার জানালাটা এখন দশকের ব্যবধানে নয়, বরং বছরের ব্যবধানে পরিমাপযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির ব্যবসা মোট দেশজ উৎপাদনের ৫% এবং ১৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির সমতুল্য। এক কোটি চাকরি গাড়ি, যন্ত্রাংশ ও ডিলারশিপের সাথে জড়িত — এটা এমন সব অঞ্চলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড যার সামনে কোনো সুস্পষ্ট বিকল্প নেই।

করণীয় পরিকল্পনা প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমত, ভূ-রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও যৌথ উৎপাদন, প্ল্যাটফর্ম ও ইঞ্জিন ভাগাভাগি করে এবং বিশেষ করে ব্যাটারি প্রযুক্তি, ইভি চার্জিং অবকাঠামো, স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং ও সফটওয়্যারের মতো বড় অঙ্কের খাতে জোট বেঁধে স্কেল ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, সফটওয়্যার উন্নয়ন, উৎপাদন ও সহায়ক কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পূর্ণ মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে, শুধু পরীক্ষণ চালানোর পর্যায়ে নয়। তৃতীয়ত, গাড়ির সম্পূর্ণ জীবনচক্র জুড়ে ডিলার ধরে রাখা ও সাবস্ক্রিপশনের মতো সেবার মাধ্যমে এবং রোবটিক্স, প্রতিরক্ষা, শক্তির ব্যাটারি সংরক্ষণ বা ডাটা সেন্টারের মতো পার্শ্ববর্তী বাজারে আয় বৃদ্ধি করতে হবে।

সবশেষে, একটি জোট-গঠনগত দর্শনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কল্পনা করুন, পশ্চিমা একটি গাড়ি কোনো একক কোম্পানি নয়, বরং সিলিকন ভ্যালির স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার, ভিসি-সমর্থিত স্টার্টআপের ব্যাটারি প্রযুক্তি, ডেট্রয়েটের দক্ষ উৎপাদন ও পশ্চিম উপকূলের কিংবদন্তি নকশার সমন্বয়ে তৈরি হলো। এমন গাড়ি কেবল চীনের সেরা গাড়ির সাথে প্রতিযোগিতা করবে না, বরং তাকে হারিয়ে দেবে। জরিপের আরেকটি ভয়ংকর ইঙ্গিত হলো, আগামী দশ বছরে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের যে সংজ্ঞা, তা গুণগত মান, ঐতিহ্য ও আরাম থেকে সরে গিয়ে চালক-সহায়তা প্রযুক্তি, ইঞ্জিন উদ্ভাবন ও স্থায়িত্বের মাঠে নির্ধারিত হবে—অবিকল সেই এলাকা যেখানে চীনা নির্মুলারা সবচেয়ে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। যে সব ব্র্যান্ড এখনই নড়বে না, তারা কেবল বাজারের অংশীদারি হারাবে না, বরং ব্র্যান্ডের অন্তর্নিহিত অর্থই ঝুঁকিতে পড়বে।