রাশিয়ার অর্থনীতি বর্তমানে একটি গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জ্বালানি সংকট ইতোমধ্যে তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং ব্যাংকিং খাতে এক বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরকারি বাজেটের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই চাপ সামলাতে ক্রেমলিন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তারল্য অর্থনীতিতে প্রবাহিত করেছে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে লক্ষ লক্ষ রুশ নাগরিককে একইসঙ্গে তিন বা তার বেশি ঋণ নিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু এখন ঋণের বোঝা ও খেলাপি ঋণের হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে ভোক্তারা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপে জর্জরিত।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে প্রস্তুতকৃত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় কর্পোরেট ঋণের ১০ শতাংশ পরিশোধ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। শীর্ষ কয়েকটি ব্যাংকের খুচরা ঋণের ১৫ শতাংশও খেলাপি হতে পারে। গত বছর দেউলিয়া ঘোষণাকারী রুশ নাগরিকের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তবে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় ঋণ কর্মসূচি, পুনর্গঠন এবং সরকারি সাহায্যের কারণে প্রকৃত অবস্থা অস্পষ্ট হয়ে আছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি একটি গতিশীল অর্থনীতির ভ্রম সৃষ্টি করছে, যা বাস্তবে একটি বিস্ফোরক অবস্থাকে লুকিয়ে রাখে। ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে উচ্চাভিলাষী নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের মতো কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা এই পরিস্থিতি ট্রিগার করতে পারে।
রাশিয়ার আর্থিক খাতের এই অবনতি যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পারফরম্যান্সের প্রতিচ্ছবি। ইউক্রেনের নতুন কৌশল ও ড্রোন হামলা রুশ অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিয়েছে, হতাহতের সংখ্যা প্রতিস্থাপনের হার ছাড়িয়ে গেছে এবং দেশটির তেল পরিকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। রিফাইনারিগুলোর ক্ষতির ফলে সারা দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, তেলের দাম কমে যাওয়া এবং ইউক্রেনের রপ্তানি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় ক্রেমলিনের জ্বালানি রাজস্ব মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ফলে মে মাসের শেষে রাশিয়ার ফেডারেল বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ ট্রিলিয়ন রুবেলে (প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার), যা ২০২৫ সালের স্তরের দ্বিগুণেরও বেশি। এই ঘাটতি সার্বিক বছরের জন্য নির্ধারিত ৩.৮ ট্রিলিয়ন রুবেলের পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। সরকার সার্বভৌম সম্পদ তহবিল থেকে রিজার্ভ খরচ করে এই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু সেই তহবিল প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ চালানোর জন্য অন্যান্য উৎস খুঁজতে গিয়ে ক্রেমলিন এখন সাধারণ জনগণের সঞ্চয়ের দিকে নজর দিতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় এমন একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনাধীন পেনশন সঞ্চয় তহবিল থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। একইভাবে, রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা সম্প্রতি পার্লামেন্টে দাবি করেছেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থাকা ১৩০ ট্রিলিয়ন রুবেল দেশের অর্থনৈতিক ও বাজেট সংকট মোকাবিলায় 'সংগঠিত' করা উচিত। এই ধরনের আলোচনা রুশ ব্যবসায়িক মহলে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, যারা ইতোমধ্যে উচ্চ সুদের হার ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে। মস্কোর এক নির্বাহী ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, সরকার যেকোনো উপায়ে অর্থ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সবাই এখন নিজেদের অর্থ সরিয়ে নেওয়ার ও দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছে।
রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে সতর্কতা কয়েক মাস ধরে জোরালো হচ্ছে। গত জুনে রুশ ব্যাংকগুলি ঋণ সংকটের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, কারণ উচ্চ সুদের হার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। একই মাসে রাশিয়ান ইউনিয়ন অফ ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টস অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারস-এর প্রধান অনেক কোম্পানি 'প্রি-ডিফল্ট অবস্থায়' রয়েছে বলে সতর্ক করেছিলেন। ডিসেম্বরে একটি রাষ্ট্রীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক পূর্বাভাস দিয়েছিল, ঋণ সমস্যা আরও বাড়লে এবং আমানতকারীরা অর্থ তুলে নিলে অক্টোবরের মধ্যে দেশ ব্যাংকিং সংকটের মুখে পড়তে পারে। এ বছর শুরুর দিকে রুশ কর্মকর্তারা পুতিনকে জানিয়েছিলেন, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে গ্রীষ্মের মধ্যে আর্থিক সংকট আঘাত হানতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, জানুয়ারিতে রুশ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাণিজ্যিক বিল পরিশোধ না করার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০৯ বিলিয়ন ডলার। মে মাসে ইজভেস্টিয়া পত্রিকার সূত্র জানিয়েছে, বন্ড মার্কেটের প্রায় ২৫ শতাংশ এখন ডিফল্টের ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ স্বল্প সুদে ঋণ নেওয়া ব্যবসাগুলোকে এখন অনেক বেশি সুদে পুনঃঅর্থায়ন করতে হচ্ছে। এ বছর পুনঃঅর্থায়ন করতে হবে এমন ঋণের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, যা নগদ প্রবাহের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং তারল্যের জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র করছে। প্রতিবেদনে একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে ডিফল্ট সমস্যাটিকে একটি পদ্ধতিগত প্রবণতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।



