ইরানের হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি ইরাক। দেশটির মোট তেল রপ্তানির ৯৫ শতাংশই এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে ইরানের নিয়ন্ত্রণের কারণে ইরাক তার প্রধান রপ্তানি পথে বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন। সম্প্রতি জ্বালানিবাণিজ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভোরটেক্সা জানিয়েছে, মে মাসে সমুদ্রপথে ইরাকের তেল রপ্তানি গত বছরের গড়ের মাত্র ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ ইরাকের জাতীয় বাজেটের ৯০ শতাংশই আসে তেল বিক্রি থেকে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরাক, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র পুরোনো একটি পাইপলাইন পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করছে। মিডল ইস্ট আইকে ইরাকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নেতারা এই তথ্য জানিয়েছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় শহর কিরকুক থেকে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলবর্তী শহর বানিয়াস পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মাইল দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি আবার চালু করা হবে। ১৯৫২ সালে ইরাকের পেট্রোলিয়াম কোম্পানি এই লাইন নির্মাণ করেছিল, যার দৈনিক ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় তিন লাখ ব্যারেল।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সিরিয়া ইরানের পক্ষ নিলে ১৯৮০-এর দশকে বাগদাদ এই পাইপলাইন বন্ধ করে দেয়। পরে ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময় পাইপলাইনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে এটি পুরোপুরি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। ওই অঞ্চলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, নতুন স্টোরেজ ট্যাংক, পাম্প ও বৈদ্যুতিক সিস্টেমসহ পুরো লাইনটি কার্যত বদলে ফেলতে হবে, যার জন্য দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। ইতিমধ্যে কয়েকটি মার্কিন কোম্পানিকে একটি কনসোর্টিয়ামে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যা প্রকল্পটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গভীর আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।
আগামী সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির বৈঠকে পাইপলাইন চুক্তি প্রকাশ পেতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তুরস্কে নিযুক্ত ট্রাম্পের রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়া-ইরাকবিষয়ক দূত টম বারাক এই চুক্তির বিস্তারিত নিয়ে কাজ করছেন। ইরাকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, বারাক এই প্রকল্পকে লেভান্ট অঞ্চলের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মডেল হিসেবে ব্যবহার করতে চান, যা যুক্তরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য লাভজনক হবে বলে তিনি মনে করেন।
সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা, যিনি বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন, তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাচ্ছেন। গত সপ্তাহে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প শারার প্রশংসা করে তাকে ‘অসাধারণ’ ও ‘উচ্চ সম্মানের ব্যক্তি’ বলে আখ্যায়িত করেন। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সিরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে এবং সিরিয়াকে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা থেকেও বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই পদক্ষেপ পাইপলাইন প্রকল্পে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের পথ আরও সুগম করবে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরাক সরকার হাদিসা ও কিরকুক থেকে বানিয়াস পর্যন্ত পাইপলাইনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে মার্কিন কোম্পানি ক্যাপিটাল টিআই, শেভরন এবং কাতারের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তি অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি, পাইপলাইন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সিরিয়ার প্রতিও ইরাকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক স্বতন্ত্র বিশ্লেষক সারহাং হামাসাইদ মিডল ইস্ট আইকে বলেন, যুদ্ধের বাস্তবতা ইরাককে বুঝিয়ে দিয়েছে যে তাদের সিরিয়ার প্রয়োজন। তবে বাগদাদ সরকারের ওপর শিয়া মতাবলম্বী রাজনৈতিক দল ও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়াদের প্রভাব রয়েছে, যারা সুন্নি নেতা শারার সাথে কাজ করতে দ্বিধাবোধ করে।


