বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এখন আর কেবল জ্বালানি বাজারের সাময়িক ধাক্কা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সংকট বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের গঠনগত পরিবর্তনের দ্বার উন্মোচন করেছে। বাজারের দ্রুত অভিযোজনের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে ভাবছে—একক সরবরাহকারী, নির্দিষ্ট বন্দর বা একমাত্র পরিবহন পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়েই জ্বালানি নিরাপত্তা ও পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ নিয়েছে। একটি মাত্র দেশের ওপর ভরসা না রেখে বিকল্প উৎস খোঁজার পাশাপাশি নতুন পরিবহন পথ ও মজুতকেন্দ্র গড়ে তোলার কাজ জোরদার হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সরবরাহব্যবস্থার নকশা এখন কেবল ব্যয় সাশ্রয়ের হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলার সক্ষমতা তার সমান গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়ে পরিণত হবে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্টার ফর এনার্জি অ্যানালিটিকসের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সাবেক তেল বিশ্লেষক নিল অ্যাটকিনসনের ভাষায়, সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে পরিস্থিতি বিপর্যয়কর মনে হলেও বাজার দ্রুততার সঙ্গে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে নিয়েছে। বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার, উপসাগরের বাইরে অতিরিক্ত উৎপাদন বৃদ্ধি, কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড় দেওয়া এবং চাহিদা হ্রাস—এই চারটি উপাদানের সমন্বয়ে বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

মার্চে গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস ছিল, হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছুঁতে পারে। কিন্তু বাস্তবতায় পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবনতি সত্ত্বেও ব্রেন্টের দাম ৩০ এপ্রিল সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে পৌঁছে পরবর্তীতে কমতে শুরু করে। বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসজাত তরল পণ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত হয়; সংকটকালে এই প্রবাহের উল্লেখযোগ্য অংশ বিকল্প পথে স্থানান্তরিত হয়েছে।

সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরগামী পাইপলাইনের মাধ্যমে অধিক পরিমাণ তেল পাঠিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ফুজাইরাহ বন্দর দিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিমাণ বাড়িয়েছে, যা হরমুজকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। আমিরাত সরকার হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে পাইপলাইন ও বন্দরের অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে; ফুজাইরাহ ও খোর ফাক্কানের মাধ্যমে বাড়তি পণ্য পরিবহন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশায় বসে না থেকে অবকাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা নির্মাণই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।

বিপরীত দিকে এশিয়ার প্রধান আমদানিকারক—চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত—উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে। তারা একদিকে কৌশলগত মজুত ব্যবহার করেছে, অন্যদিকে চাহিদা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, কানাডা, কাজাখস্তান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো উৎপাদক দেশগুলো রপ্তানি বাড়িয়ে ঘাটতির একাংশ পূরণ করেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া উপসাগরীয় তেলের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও নরওয়ে থেকে আমদানি বৃদ্ধি করেছে; সংকট কাটলেও তারা আগের মতো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল অবস্থায় ফিরবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

অ্যাটকিনসনের বিশ্লেষণে, বাজারের এই অভিযোজনক্ষমতা মূলত স্বল্পমেয়াদি। সংকট এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবু কিছু প্রবণতা স্পষ্ট: উপসাগরীয় রপ্তানিকারকেরা বিকল্প রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে এবং এশিয়ার ক্রেতাদের নিকটবর্তী অঞ্চলে তেল মজুতের সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে পারে। আমদানিকারকরাও কোনো একটি দেশ বা পরিবহনপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চাইবে এবং ভবিষ্যতে সরবরাহের উৎস আরও বহুমুখী করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখবে।

এই উপলব্ধির সঙ্গে কোভিড–১৯ মহামারির সময়কার অভিজ্ঞতার সাদৃশ্য লক্ষণীয়। ওই সময় পশ্চিমা দেশগুলো চীন থেকে কারখানা সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও সেই প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়নি। বাস্তবতা হলো, সংকটের সময় এ ধরনের সচেতনতা সবারই বেড়ে যায়, কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ ও নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।

যদিও হরমুজের প্রভাব কেবল জ্বালানির বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের পণ্য বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। তাই গুরুত্বপূর্ণ কোনো নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সরবরাহব্যবস্থায় দ্রুত প্রতিফলিত হয়। হরমুজ দিয়ে তেলের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), পেট্রোকেমিক্যাল ও সার পরিবহন হয়—যা শিল্প উৎপাদন ও কৃষির জন্য অপরিহার্য। যার ফলে নৌপথের অনিশ্চয়তা শুধু জ্বালানির দাম নয়, খাদ্য ও শিল্পপণ্যের মূল্যেও চাপ সৃষ্টি করেছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরুর সময় ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য সূচকের মান ছিল ১২৫; এখন তা ১৩১-এ পৌঁছেছে। তুলনামূলকভাবে, ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে ওই বছরের সূচক ১৪৪-এ উঠেছিল। অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্যমূল্য এখনো তুলনামূলক সীমার মধ্যেই রয়েছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্যবিষয়ক বিভাগের পরিচালক লুজ মারিয়া দে লা মোরা বলছেন, হরমুজের সংকট সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো আরও স্পষ্ট করে তুলেছে এবং আরও স্থিতিস্থাপক ও বৈচিত্র্যময় ব্যবস্থা গড়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। আঙ্কটাডের হিসাব অনুযায়ী, ৬১টি দেশ একই সঙ্গে উচ্চ জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিতে মূল্য ধাক্কার ঝুঁকির মুখে; এসব দেশের বেশির ভাগই তেল ও খাদ্যশস্যের নিট আমদানিকারক। তাদের বাড়তি জাহাজভাড়া, বিমা ব্যয় ও জ্বালানি বিল বহন করতে হচ্ছে। দে লা মোরা জোর দিয়ে বলেন, সরবরাহকারী পরিবর্তন বা নতুন পরিবহনপথে যাত্রা রাতারাতি সম্ভব নয়—এর জন্য নতুন অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক অপরিহার্য।

সংঘাতের আগে হরমুজ দিয়ে যাতায়াতের জন্য একটি বড় তেলবাহী জাহাজের বিমা খরচ ছিল প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। সংঘাতের পর তা সর্বোচ্চ এক কোটি ডলারে পৌঁছেছে—অর্থাৎ প্রায় ৪০ গুণ বৃদ্ধি। গালফ নিউজের তথ্য অনুসারে, সংকটের চূড়ান্ত সময়ে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এখনো কয়েক হাজার নাবিক ওই অঞ্চলে আটকা পড়ে আছেন। এই বাড়তি বিমা ব্যয় শেষ পর্যন্ত জাহাজমালিকের ওপরই সীমাবদ্ধ থাকে না; ভোক্তাদের ঘাড়ে চেপে বসে।

আঙ্কটাড সতর্ক করেছে, এই সংকট বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফ্রিকা ঘুরে জাহাজ চলাচলের ফলে পণ্য পৌঁছাতে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগছে। ব্যবসা ও ভোক্তা—উভয়েরই খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একক পথের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়েও স্পষ্ট।

হরমুজ সংকটের আগেই পরিবর্তনের সূত্রপাত হয়েছিল। কোভিড–১৯ মহামারির পর বিশ্বজুড়ে সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রবণতা শুরু হয়; কারখানা বন্ধ, বন্দর জট ও পরিবহনে বাধার কারণে একক অঞ্চল বা দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি তখনই উন্মোচিত হয়। হরমুজের অস্থিরতা সেই প্রবণতাকে আরও জোরদার করতে পারে। ভবিষ্যতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো একই পণ্যের জন্য একাধিক সরবরাহকারী, বিকল্প বন্দর, বিভিন্ন পরিবহনপথ ও বিভিন্ন অঞ্চলে মজুত রাখার কৌশল নিতে পারে। বিভিন্ন দেশের সরকারও কৌশলগত মজুত ও বিকল্প অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব কমে যাবে। বিশ্ব জ্বালানির বাজারে মধ্যপ্রাচ্য এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ অঞ্চলগুলোর একটি। পরিবর্তনটি হতে পারে নির্ভরতার ধরনে—একটি নির্দিষ্ট পথ বা সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বদলে একাধিক উৎস ও পথের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায়।

জাহাজ পরিবহন কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষণীয়। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলেও জাহাজ চলাচল আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগতে পারে। জাহাজমালিক, নাবিক ও বিমা কোম্পানিগুলোকে আগে নিশ্চিত হতে হবে যে, ওই পথে চলাচল নিরাপদ। ফ্রান্সভিত্তিক শিপিং কোম্পানি সিএমএ সিজিএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রুদলফ সাদে স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রণালি খুলে গেলেই সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে আসবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। ভবিষ্যতে আবারও সংকট তৈরি হতে পারে; শুধু একটি প্রণালির ওপর নির্ভর করে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা কাটিয়ে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানে জোর দেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘস্থায়ী সংকট বিশ্ব অর্থনীতির বড় ক্ষতি করছে। সংকটের সবচেয়ে টেকসই প্রভাব সম্ভবত তেলের বাজারমূল্যের ওঠানামায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পণ্য সরবরাহ কীভাবে সংগঠিত হবে, সেখানেই এর গভীর ছাপ পড়বে। ভবিষ্যতে কম ব্যয়ের পাশাপাশি সরবরাহের নিশ্চয়তা, বিকল্প নৌপথ ও ঝুঁকি সামলানোর দক্ষতা—এই তিনটি বিষয় ব্যবসা-বাণিজ্যের সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় স্থান দখল করতে পারে।