বুধবার সকালে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার (২৮ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার) মূল্যের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক। কিন্তু সেই সময়সীমার দুই ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, এই নতুন কর আরোপ তিন দিনের জন্য স্থগিত থাকবে। তাঁর ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একটি বাণিজ্য চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং নথিপত্র সম্পন্ন হওয়ার সাপেক্ষে উভয় পক্ষের মধ্যে ‘চুক্তি’ হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, “আমি কানাডার বিরুদ্ধে ৫০ শতাংশ শুল্ক, যা আগামীকাল সকাল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, তা তিন দিনের জন্য স্থগিত করেছি।” এই বিলম্বের পেছনে তিনি উভয় দেশের মধ্যে চুক্তির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
জুলাই মাস থেকে বাণিজ্য আলোচকরা তীব্র আলোচনা চালিয়ে আসছেন। এর আগে ১৯ আগস্টের সময়সীমা নির্ধারণ করে ট্রাম্প নতুন কর আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দুবার কথা বলেছেন। দুপক্ষের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে অচলাবস্থা রয়ে গেছে—বিশেষত মার্কিন অটোর ওপর শুল্ক এবং কানাডার বেশিরভাগ প্রদেশে মার্কিন মদ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা।
ট্রাম্প আরও জানান, চূড়ান্ত চুক্তির ফলে কীস্টোন এক্সএল পাইপলাইনের পুনরুজ্জীবন সম্ভব হতে পারে। আলবার্টা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল পরিবহনের এই প্রকল্পকে পূর্বে ওবামা ও বাইডেন প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছিল। পরিবেশবাদী ও আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই পাইপলাইনের বিরোধিতা করে আসছে। তবু ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, তিনি এই প্রকল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে চান, যা দৈনিক ৮ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল তেল বহন করতে সক্ষম। “দ্য গ্রেট কীস্টোন এক্সএল পাইপলাইন, যা স্লিপি জো বাইডেনের হাতে বহুদিন আগে নিহত হয়েছিল, হয়তো কবর থেকে জেগে উঠবে!”—ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছেন তিনি।
এই বিলম্ব কানাডার আলোচকদের জন্য স্বস্তির খবর। সীমান্তের উভয় পাশের ব্যবসায়ীরাও সতর্ক করেছেন যে নতুন শুল্ক উভয় দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। জানুয়ারিতে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। তিনি বৈশ্বিক পর্যায়ে ব্যাপক শুল্ক কর্মসূচি চালু করেন, যা কয়েক দশক ধরে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যের ধারাকে উল্টে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক হুমকির শুল্ক প্রয়োগ হওয়ার কথা ছিল কানাডিয়ান ওয়াইন, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক ও হকি সরঞ্জামের ওপর। এগুলো ইতিমধ্যে কানাডার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম, অটো এবং কাঠের ওপর আরোপিত মার্কিন শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হতো। কানাডা চাইছে, এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর ওপর থেকে মার্কিন শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাস করা হোক।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র কানাডার কাছ থেকে বেশ কিছু ছাড় চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন গাড়ির ওপর কানাডার পাল্টা শুল্ক প্রত্যাহার, মার্কিন পনির উৎপাদকদের জন্য বেশি বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে দুগ্ধ কোটা সমন্বয়, এবং গত বছর বেশিরভাগ প্রদেশে আরোপিত মার্কিন মদের বিক্রির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
বুধবারের সময়সীমার শেষ মুহূর্তে আলোচকরা এমন একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, যা কানাডিয়ান গাড়ির ওপর মার্কিন শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করতে পারে—রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বেনামি সূত্রের বরাতে এমনটি জানা গেছে। তবে কোন গাড়িগুলো এই হ্রাসকৃত শুল্কের আওতায় পড়বে, সে বিষয়ে দুপক্ষ একমত হতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, শুধুমাত্র সেইসব গাড়ির জন্য এটি প্রযোজ্য হোক, যেগুলোতে মার্কিন তৈরি উপাদানের পরিমাণ বেশি।
মদের বিক্রির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য কার্নিকে প্রাদেশিক প্রিমিয়ারদের সমর্থন নিতে হবে, কারণ মদ বিক্রির নিয়ন্ত্রণ প্রদেশগুলোর হাতে, কেন্দ্রীয় সরকারের নয়। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড, যাঁর প্রদেশ মার্কিন অটো শুল্কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, বলেছেন তিনি শুধুমাত্র “ন্যায্য চুক্তি” হলে মদের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পক্ষে। মঙ্গলবার মার্কিন চেম্বার অব কমার্স একটি বিবৃতিতে চুক্তির পক্ষে জোরালো আহ্বান জানায়। সংস্থাটি বলেছে, “উচ্চতর শুল্ক উভয় অর্থনীতির ক্ষতি করবে, মার্কিন পরিবারের ব্যয় বাড়াবে, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল আরও ব্যাহত করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির অধীনে নির্ভরশীল ১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন চাকরির ঝুঁকি তৈরি করবে।”




