আধুনিক ফুটবলে মাঠের ভেতর খেলোয়াড়দের গায়ে আর দেখা যায় না চকচকে গয়নার ঝিলিক। কিন্তু ষাট থেকে নব্বই দশকের ছবিতে ফুটবল কিংবদন্তিদের গলায় সোনার চেইন, কানে দুল, হাতে আংটি স্বাভাবিক দৃশ্য ছিল। পেলে, ম্যারাডোনা, রোনালদিনিও, ডেভিড বেকহ্যাম, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো—সবারই নিজস্ব গয়না ছিল, যা তাদের ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে উঠেছিল।
১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ফাইনালের পর পেলের গলায় দেখা যায় একটি পেনডেন্টযুক্ত চেইন। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ম্যারাডোনাকে সোনার চেইন, কানের দুল ও আংটি পরে খেলতে দেখা গেছে। ব্রাজিলের রোনালদিনিও বার্সেলোনায় খেলার সময় ‘R’ আদ্যক্ষর খোদাই করা নেকলেস ও হীরার স্টাড কানের দুল পরতেন। বেকহ্যামের কানের ডায়মন্ড স্টাড ও চেইন তাকে ফ্যাশন আইকনে পরিণত করেছিল। এমনকি ২০০৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে তরুণ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও দুই কানে দুল পরতে দেখা গেছে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনালে জিনেদিন জিদান হাতে বিয়ের আংটি পরে খেলেছিলেন। এসব তখন খেলোয়াড়দের ব্যক্তিত্বেরই অংশ হিসেবে ধরা হতো।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম বদলে গেছে। ফুটবলের গতি ও বডি-কন্ট্যাক্ট বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ১৯৯৭ সালে লজ অব দ্য গেম সংশোধনের পর ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) ৪ নম্বর ধারায় খেলোয়াড়দের সরঞ্জাম নিয়ে নির্দেশনা কঠোর করা হয়। বর্তমান আইন অনুযায়ী নেকলেস, আংটি, ব্রেসলেট, কানের দুলসহ যেকোনো ধরনের গয়না পরে মাঠে নামা নিষিদ্ধ। এমনকি টেপ দিয়ে ঢেকে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, একটি চেইন প্রতিপক্ষের শরীরে আটকে গুরুতর আঘাতের কারণ হতে পারে, আংটি আঙুলে চোটের ঝুঁকি বাড়ায় এবং কানের দুল ছিঁড়ে গিয়ে কানের লতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ম্যাচ শুরুর আগে রেফারিরা খেলোয়াড় ও বদলি খেলোয়াড়দের সরঞ্জাম খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন। গয়না পাওয়া গেলে খুলে ফেলতে বলা হয়। নির্দেশনা অমান্য করলে মাঠের বাইরে যেতে হতে পারে। এই কঠোর নিয়মের পরও মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রম ঘটে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ডিফেন্ডার জুলস কুন্দে প্রায় আধঘণ্টা গলায় চেইন পরে খেলেছিলেন। পরে সহকারী রেফারির নজরে আসায় খেলা থামিয়ে তা খুলতে বলা হয়, যা সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হয়।
অন্যান্য খেলার তুলনায় ফুটবলে নিয়ম সবচেয়ে কঠোর। বেসবলে অনেক খেলোয়াড় মাঠে চেইন পরে খেলতে পারেন, বাস্কেটবল বা আইস হকিতে তুলনামূলক নমনীয়তা আছে। তবে বক্সিং, এমএমএ এবং ভলিবলের মতো খেলায়ও নিরাপত্তার কারণে গয়না পরার বিধিনিষেধ রয়েছে।
তবে মাঠের বাইরে আধুনিক ফুটবলারদের স্টাইল থেকে গয়না একটুও হারিয়ে যায়নি। বরং তা আরও বেশি দৃশ্যমান। দলীয় বাসে ওঠা, স্টেডিয়ামে পৌঁছানো, ওয়ার্মআপ, ড্রেসিংরুম, ফ্যাশন ফটোশুট, ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই চেইন, আংটি, ব্রেসলেট বা বিলাসবহুল ঘড়ি এখন ফুটবলারদের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম। নেইমার, লামিনে ইয়ামাল, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো ডি পল, এনসো ফার্নান্দেজের মতো তারকারা মাঠের বাইরে জমকালো গয়নার জন্য পরিচিত।
ফুটবলের বর্তমান রূপ নিঃসন্দেহে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও পেশাদার। খেলোয়াড়দের সুরক্ষার স্বার্থে গয়না নিষিদ্ধের যৌক্তিকতা স্পষ্ট। তবু পুরোনো ম্যাচের ভিডিওতে যখন কোনো তারকার গলায় চেইন বা দুলের ঝিলিক ধরা পড়ে, তখন ফুটবলপ্রেমীরা নস্টালজিক হয়ে পড়েন। হয়তো তাঁরা গয়নাটি নয়, বরং সেই সময়ের ফুটবলের নির্ভার ব্যক্তিত্ব ও মানবিক গল্পগুলোই বেশি মিস করেন।


