লোকমুখে প্রচলিত একটি গল্পে বলা হয় যে, সুলতানুল মাশায়েখ হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া একসময় ডাকাত ছিলেন এবং ১০০টি খুনের সাথে জড়িত ছিলেন। তবে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ও আদি গ্রন্থ এই ধারণাকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে রচিত ফারসি কিতাব ‘সিয়ার আল আউলিয়া’, ‘আফজাল আল ফাওয়ায়েদ’ এবং ‘ফাওয়ায়েদ আল ফাওয়াদ’-এর তথ্যানুযায়ী, খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া কোনোকালেই ডাকাত ছিলেন না এবং কোনো হত্যাকাণ্ডেও লিপ্ত হননি।

১২৩৮ খ্রিষ্টাব্দে বাদাউনে জন্মগ্রহণকারী খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার পারিবারিক ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর পূর্বপুরুষ খাজা আরব (নানা) এবং খাজা আলী (দাদা) মোঙ্গল আক্রমণের সময়ে বোখারা থেকে হিজরত করে লাহোর হয়ে উত্তর প্রদেশের বাদাউনে বসতি স্থাপন করেছিলেন। বংশলতিকার দিক থেকে তিনি নবী করিম (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বংশধর ছিলেন। তাঁর বাবা খাজা সৈয়দ আহমদ বাদাউনের জামে মসজিদের ইমাম এবং একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। শৈশবে পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মা হজরত সৈয়দা বিবি জুলাইখা অত্যন্ত কষ্ট করে চরকায় সুতা তৈরি ও তা বিক্রি করে সংসার পরিচালনা করেন এবং নিজামউদ্দিন আউলিয়ার শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করেন।

১৬ বছর বয়স পর্যন্ত বাদাউনে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তর শেষ করার পর তাঁকে ‘দানেশমান্দ’ বা জ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতির চিহ্ন হিসেবে ‘দস্তারবন্দী’ বা পাগড়ি পরানোর প্রথা ছিল। খাজা আলী নামক এক বুজুর্গ তাঁকে দস্তারবন্দী করান, আর সেই বিশেষ পাগড়িটি তাঁর মা নিজ হাতে সেলাই করে তৈরি করেছিলেন। পণ্ডিত মাওলানা আলাউদ্দিন উসুলির কাছে তিনি অভিধানশাস্ত্র বা ‘লুগাত’ অধ্যয়ন করেন।

পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে মা, বোন এবং এক গৃহপরিচারিকাকে সাথে নিয়ে তিনি দিল্লিতে চলে আসেন। সেখানে তিনি মাওলানা কামালউদ্দিন জাহেদের কাছে হাদিসশাস্ত্র mempelajari করেন এবং হাদিস পাঠদানের অনুমতিপত্র লাভ করেন। তিনি ‘মাশারেক্ব আল আনওয়ার’ নামক হাদিসের কিতাবটি সম্পূর্ণ মুখস্থ করেছিলেন। পাশাপাশি মাওলানা শামসউদ্দিনের কাছে সাহিত্যের পাঠ নেন। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, বাগ্মিতা এবং জ্ঞানের কারণে তিনি সমকালীন মহলে ‘মাহফিল শিকন’ (সভা ভঙ্গকারী) এবং ‘নিজামউদ্দিন বাহহাস’ (বিতার্কিক নিজামউদ্দিন) হিসেবে পরিচিতি পান।

শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি প্রথমে বিচারক বা ‘কাজি’ হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। তবে চিশতিয়া তরিকার খাজা নজিবউদ্দিন মুতাওয়াক্কেলের উপদেশে তিনি সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। নজিবউদ্দিন মুতাওয়াক্কেলের পরামর্শে এবং মায়ের অনুমতি নিয়ে ২০ বছর বয়সে তিনি আজোধানে বাবা ফরিদ গঞ্জে শকরের দরবারে যান। সেখানে বায়াত হওয়ার পর দ্রুত আধ্যাত্মিক উন্নতি করেন এবং বাবা ফরিদের প্রধান খলিফা হিসেবে খেলাফত লাভ করেন।

দিল্লিতে ফিরে এসে তিনি গিয়াসপুর নামক শহরতলিতে নিজের খানকা স্থাপন করেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে পীর হিসেবে তাঁর আধ্যাত্মিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী প্রায় ৯০ বছর তিনি নিরলসভাবে চিশতিয়া তরিকার প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত ছিলেন। ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে এই মহান সুফির ইন্তেকাল হয় এবং তাঁর মাজার দিল্লিতে অবস্থিত।