মানুষের জীবনে দু ধরনের বিস্মৃতি কাজ করে—একটি সাময়িক, অন্যটি এমন যা গোটা জীবনবোধকেই উল্টে দেয়। আল্লাহকে ভুলে যাওয়া সেই দ্বিতীয় শ্রেণির বিস্মৃতি, যার প্রভাব মানুষের হৃদয়, চিন্তা, চরিত্র এমনকি পরকাল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে একজন আলেমা ও প্রাবন্ধিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উপস্থাপন করেছেন।
আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক ফল হলো মানুষ নিজের প্রকৃত পরিচয় ও দুনিয়ায় আসার মূল উদ্দেশ্য ভুলে যায়। দেহের যত্ন নেওয়া হলেও আত্মার পরিচর্যায় উদাসীনতা দেখা দেয়; দুনিয়ার জন্য সম্পদ জমানো হলেও আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহে আগ্রহ থাকে না। সুরা হাশরের ১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, 'তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, ফলে তিনি তাদের নিজেদেরই ভুলিয়ে দিয়েছেন।' স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলে মানুষের নিজের সঙ্গে সম্পর্কও দুর্বল হয়ে পড়ে—এটিই আত্মবিস্মৃতির ভয়াবহ রূপ।
দ্বিতীয় পরিণতি হিসেবে জীবন হয়ে ওঠে সংকীর্ণ। বাহ্যিক প্রাচুর্য, বিত্ত-বৈভব, সুনাম বা সামাজিক মর্যাদা হৃদয়ের অস্থিরতা দূর করতে পারে না। সুরা রাদের ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।' সুরা ত্বহার ১২৪ নম্বর আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে, 'যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, তার জীবন হবে সংকীর্ণ।' এখানে সংকীর্ণতার মানে শুধু দারিদ্র্য নয়—ঘরে প্রাচুর্য থাকলেও অন্তরের বিপর্যয়, মানুষের ভিড়েও নিঃসঙ্গতা—এগুলোই সংকীর্ণ জীবনের লক্ষণ।
তৃতীয়ত, আল্লাহকে ভুলে গেলে দুনিয়াই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। সম্পদ, সন্তান, পদমর্যাদা, জনপ্রিয়তা—এগুলো প্রয়োজন মেটানোর বদলে আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সুরা মুনাফিকুনের ৯ নম্বর আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে, 'হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এমন করবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।' সমস্যা সম্পদ বা সন্তানে নয়, সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন এসব মানুষকে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে মানুষ দুনিয়াকে ব্যবহার করার পরিবর্তে দুনিয়ার হাতিয়ার হয়ে পড়ে।
চতুর্থ পরিণতি হলো শয়তান মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। সুরা যুখরুফের ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'পরম দয়াময়ের স্মরণ থেকে যে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করি, অতঃপর সে তার সঙ্গী হয়ে যায়।' সুরা মুজাদালার ১৯ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, 'শয়তান তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং তাদের আল্লাহর জিকির ভুলিয়ে দিয়েছে।' তখন গুনাহ আর আগের মতো ভয়ংকর মনে হয় না, হারামকে যুক্তি দিয়ে বৈধ বলে মনে হয় এবং পাপের পর অনুশোচনা কমে আসে।
পঞ্চম এবং সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করে আখেরাতে। সুরা ত্বহার ১২৪-১২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, এমন ব্যক্তি কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উঠবে এবং বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় কেন উঠালেন? অথচ আমি তো দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ছিলাম।' আল্লাহ উত্তর দেবেন, 'এভাবেই তো আমার নিদর্শনাবলি তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। আজ তেমনিভাবেই তোমাকে ভুলে যাওয়া হবে।' ইবনে নাসির সাদির তাফসির অনুযায়ী, দুনিয়ায় যারা আল্লাহর স্মরণ বিমুখ ছিল, আখেরাতে তাদের অন্ধ, বধির ও বোবা অবস্থায় জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে।
তবে আলেমা মনে করিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার পরিণতি যত ভয়াবহই হোক, তাঁর দিকে ফেরার দরজা এখনো খোলা। নিজের ভুল উপলব্ধিই প্রত্যাবর্তনের প্রথম ধাপ। সুরা জুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, 'আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।' আল্লাহর স্মরণ মানে জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তাঁর বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যে তাঁর ভয় ধারণ করা, নিয়ামতের শোকর আদায় করা, বিপদে তাঁর ওপর ভরসা রাখা এবং গুনাহ হয়ে গেলে দেরি না করে তওবার মাধ্যমে রবের দিকে ফিরে আসা।




