মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য বোঝার জন্য আর কেবল উপসর্গের অপেক্ষা করতে হবে না। আধুনিক গবেষণা ও প্রযুক্তি এখন মস্তিষ্কের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে আগাম তথ্য দিতে সক্ষম। ল্যাংকাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজিস্ট হেডলি এমসলির মতে, শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য নিয়েও মানুষ এখন আগেভাগে সচেতন হচ্ছে। রোগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেকে।
জিন পরীক্ষা এবং ব্রেইন স্ক্যান মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কিছু ধারণা দিলেও বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতি সম্পর্কে সতর্ক। APOE4 জিন উপস্থিত থাকার অর্থ এই নয় যে অ্যালঝেইমার্স হবেই; বরং জীবনযাপন পদ্ধতি এখানে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। তাই সাধারণ জনগণকে এই ধরনের জিন পরীক্ষা করতে উৎসাহিত করা হয় না। এমআরআই স্ক্যানের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা: প্রায় ৪ শতাংশ স্ক্যানে ছোটখাটো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে, যা হয়তো কোনো ক্ষতি করে না বরং অহেতুক দুশ্চিন্তার সৃষ্টি করে। ফলে উপসর্গ না থাকলে রুটিন স্ক্যানের পরামর্শ দেওয়া হয় না।
রক্ত পরীক্ষায় মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া সম্ভব। ভিটামিন বি-১২, ফলেট ও থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইভজেনিয়া লোবানোভার নেতৃত্বে এক দল রক্তে একধরনের প্রোটিন কণা চিহ্নিত করেছেন যা মস্তিষ্কের রোগ প্রতিরোধ কোষগুলো বিপদে পড়লে ছাড়ে। এই কণা পরীক্ষার মাধ্যমে উপসর্গের পাঁচ বছর আগেই পারকিনসন্স ও অ্যালঝেইমার্স শনাক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
হাতের স্মার্টওয়াচ এখন মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে সহায়তা করছে। ঘুমের সময় গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম মস্তিষ্কের ক্ষতিকর প্রোটিন পরিষ্কার করে। নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের গবেষক মাইকেন নেডারগার্ড জানিয়েছেন, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের ঘুমের ছন্দ ব্যাহত হয়। এছাড়া হার্ট রেট ভ্যারিয়াবিলিটি বা এইচআরভি মাপলেও মস্তিষ্কের অবস্থা বোঝা যায়। কম এইচআরভি ডিমেনশিয়া ও বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়ায় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
ব্রেইন হেলথ ইনডেক্স সম্প্রতি জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমআরআই স্ক্যানের তথ্য বিশ্লেষণ করে মস্তিষ্কের বয়স নির্ধারণ করেন। উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা এই স্কোর বাড়ায়, ধূমপান ও ডায়াবেটিস কমায়। ২০২৪ সালে ল্যানসেট কমিশন জানিয়েছে, ১৪টি অভ্যাস পরিবর্তন করে প্রায় অর্ধেক ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ সম্ভব। ধূমপান ত্যাগ, ব্যায়াম ও সামাজিক মেলামেশা এই তালিকায় রয়েছে। নিউরোএজ প্রতিষ্ঠানের ক্রিস্টিন গ্লোরিওসোর মতে, মস্তিষ্কের বয়স পাঁচ বছর কমানো গেলে জিনগত ঝুঁকি এড়ানো যায়।
ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের লোরি কুকের নেতৃত্বে এক লাখ মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুম ও সহানুভূতি মস্তিষ্কের জন্য দারুণ উপকারী। অন্যদিকে মাল্টিটাস্কিং বা একসঙ্গে অনেক কাজ করা মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করে, যা স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজে বাধা দেয়। বর্তমানে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের একক নিখুঁত পরীক্ষা না থাকলেও ঘুম, হৃৎস্পন্দনের পরিবর্তন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক সম্পর্ক নজরে রেখে নিজের মস্তিষ্কের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।


