লাতিন আমেরিকার সর্বাধিক পঠিত কবি ও নোবেলজয়ী পাবলো নেরুদা। তাঁর ১২২তম জন্মদিন উপলক্ষে আবারও স্মরণ করা হচ্ছে এই মহান কবিকে। ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই চিলির পারলাল শহরে এক রেলশ্রমিকের ঘরে তাঁর জন্ম। আসল নাম ছিল রিকার্দো এলিয়েসের নেফতালি রেইয়েস বাসোয়ালতো। চেক কবি জান নেরুদার নাম থেকে তিনি ছদ্মনামটি গ্রহণ করেন। খুব অল্প বয়সেই কবিতা লেখা শুরু করেন তিনি। পিতার মৃত্যুর পর জীবিকা নির্বাহের জন্য ঘড়ি বিক্রি করতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত ‘কুড়িটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান’ তাঁকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়। নেরুদার কবিতায় ফুটে উঠেছে চিলির প্রকৃতি, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সংগ্রাম। মার্ক্সবাদকে জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণের পর তাঁর কবিতা পায় নতুন গতি। সমালোচকেরা তাঁকে 'রাজনৈতিক কবি' হিসেবে চিহ্নিত করে খাটো করতে চাইলেও নেরুদা মনে করতেন, রাজনীতি থেকে দূরে থাকা লেখক কল্পকাহিনির জীব। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন এবং শরণার্থীদের জন্য তহবিল গঠন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মেক্সিকোর রাস্তায় স্তালিনগ্রাদের সমর্থনে পোস্টার সেঁটেছিলেন। ১৯৪৫ সালে তিনি চিলির কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং সিনেটর নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালে ভিদেলা সরকারের অত্যাচারের শিকার হয়ে আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। সেই সময় তিনি ‘কান্তো হেনেরাল’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে ‘মাচুপিচুর শীর্ষে’ কবিতাটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। ১৯৫০ সালে পাবলো পিকাসো ও পল রবসনের সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বশান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৫৩ সালে স্তালিন শান্তি পুরস্কার (পরবর্তীতে লেনিন শান্তি পুরস্কার) পান। ১৯৬৫ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে। তিনিই প্রথম লাতিন আমেরিকান সাহিত্যিক যিনি এ সম্মান পেয়েছেন। ১৯৭০ সালে বামপন্থী সরকার গঠিত হলে তিনি প্যারিসে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। ১৯৭১ সালে ‘একটি মহাদেশের ভাগ্য ও স্বপ্নকে জীবিত করে তোলার আদি শক্তিকে কার্যকর করে কবিতা রচনা’র জন্য তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। অনেকের মতে, তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেই তিনি আগে নোবেল পাননি। নেরুদা ১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সান্তিয়াগোতে মৃত্যুবরণ করেন। সরকারিভাবে ক্যানসারকে মৃত্যুর কারণ বলা হলেও পরে বিষপ্রয়োগে হত্যার অভিযোগ ওঠে। তাঁর মৃত্যুর মাত্র ১২ দিন আগে বন্ধু ও চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আয়েন্দে সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। নেরুদার কবিতায় শুধু চিলি নয়, স্পেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, পেরু, মেক্সিকো, নিকারাগুয়া, ফ্রান্স, গ্রিস, ইতালি, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া ও চীনের মুক্তিকামী মানুষও স্থান পেয়েছে। তিনি বিশ্বশান্তি আন্দোলনের একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের 'গণসাহিত্য' পত্রিকায় মতিউর রহমানের লেখা 'চিলির কবি পাবলো নেরুদা' প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। 'অন্য আলো' অনলাইন পাঠকের জন্য প্রবন্ধটি পুনঃপ্রকাশ করেছে। নেরুদার কবিতা আজও বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে। তাঁর 'আজ রাতে আমি লিখতে পারি' কবিতায় প্রেম ও বিচ্ছেদের বেদনা অত্যন্ত সহজ ও গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি স্পেনের গৃহযুদ্ধ নিয়ে লেখা 'হৃদয়ে স্পেন' কাব্যগ্রন্থে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁর 'পলাতক' কবিতায় আত্মগোপনের দিনগুলোর স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। 'চিলির জনক' কবিতায় তিনি লুইস এমিলিও রেকাবেরেনকে সম্মান জানিয়েছেন। নেরুদা তাঁর কবিতায় ওয়াল্ট হুইটম্যান ও ভ্লাদিমির মায়াকভস্কির প্রভাব স্বীকার করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কবি হিসেবে জনগণের সঙ্গে সত্যিকার যোগাযোগ থাকা কর্তব্য। চিলির প্রতিটি গ্রাম ও শহরে তিনি তাঁর কবিতা আবৃত্তি করে বেড়াতেন। তাঁর কাব্যসাধনা ও রাজনৈতিক জীবন আজও নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
পাবলো নেরুদা: সংগ্রাম ও সাহিত্যের এক অমর নাম
স্প্যানিশ ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি পাবলো নেরুদার ১২২তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর সাহিত্যকর্ম ও রাজনৈতিক জীবনের ওপর বিশেষ আলোকপাত। তাঁর কবিতা ও সংগ্রাম আজও প্রাসঙ্গিক।


