পূর্ব গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) চলমান ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবটি রেকর্ডের দ্বিতীয় ভয়াবহতম ঘটনায় পরিণত হয়েছে, যেখানে সরকারি মৃতের সংখ্যা ১,৫০০ জনের ভয়াবহ মাইলফলক স্পর্শ করেছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, গত মে মাসে ঘোষিত এই প্রাদুর্ভাবে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এরই মধ্যে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার ভাইরাসটি দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে।

কিন্তু ঠিক এই প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেই চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির স্বাস্থ্যামন্ত্রী 'আনন্দের মুহূর্ত' হিসেবে বর্ণনা করেছেন যখন দুই সপ্তাহ আগে সর্বশেষ ইবোলা আক্রান্ত রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। উগান্ডায় এই ভাইরাসে মাত্র ২০ জন সংক্রমিত হয়েছিলেন এবং মৃত্যু ঘটেছিল দুইজনের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উগান্ডা প্রধান ডা. কাসোন্ডে মুইঙ্গার বিবৃতির বরাতে বিবিসি জানায়, এই তুলনামূলক স্বল্প সংখ্যক প্রাণহানির পেছনে কোনো ভাগ্য বা দৈবক্রম কাজ করেনি। তিনি বলেন, 'এটা হয়েছে কারণ মানুষ প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করেছিল।'

১৯১১ সালে উগান্ডার কেন্দ্রীয় লুয়েরো জেলার একটি হাসপাতালে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীর আগমনের ঘটনা এর একটি উদাহরণ। তার উপসর্গগুলো সতর্কতার জন্ম দেয়: তাকে একান্তে রাখা হয়, চিকিৎসারসকরা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম পরিধান করেন এবং তিন ঘণ্টা পর তার মৃত্যু হলে দেহটি সাবধানতার সাথে কফিনে সিল করে রাখা হয়। এই পূর্বসর্তকতাই পরবর্তীতে রক্তের নমুনা পরীক্ষায় ইবোলা হিসেবে নিশ্চিত হওয়া রোগটির বিস্তার থামাতে সক্ষম হয়।

সরকারের মুখপাত্র আবান কাজুয়্যা বিবিসি নিউজডে-কে বলেন, 'আমরা ইবোলা চিনি। এটি এখানে কয়েকবার এসেছে, আমরা জানি কিভাবে এটি সামলাতে হয়।'

এবারের প্রথম জানা আক্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন ডিআর কংগোর এক ব্যক্তি যিনি চিকিৎসার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে উগান্ডায় এসেছিলেন। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ একাধিক ঘটনা ডিআর কঙ্গো থেকে আমদানি হয়েছে বলে নিশ্চিত হতেই রাজধানী কাম্পালার মুলাগো হাসপাতালে একটি বিশেষায়িত ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্র সক্রিয় করে তোলে। কেন্দ্রটির প্রধান ডা. ডেভিড কাগ্ওয়া জানান, আগের প্রাদুর্ভাবের সময় ব্যবহার করা এই কেন্দ্রটিতে কিছু অবশিষ্ট চিকিৎসা সামগ্রী ছিল এবং একটি 'জরুরি মেডিকেল টিম' প্রস্তুত ছিল। ফলে এক দিনের মধ্যে পুরো ব্যবস্থা রোগী গ্রহণের জন্য তৈরি হয়ে যায়।

উগান্ডায় যত ২০ জনের পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে, তাদের মধ্যে ১৫ জনই এসেছিলেন ডিআর কঙ্গো থেকে। প্রথম দুজন আক্রান্ত ব্যক্তি সম্ভবত জানতেন না তাদের কী হয়েছে। কিন্তু ১৫ মে উগান্ডা ও ডিআর কঙ্গো যৌথভাবে ইবোলা প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার পর, উপসর্গযুক্ত ব্যক্তিরা সরাসরি চিকিৎসা ইউনিটে চলে আসেন। ডা. কাগ্ওয়া সন্দেহ করছেন, এই রোগীরা যেহেতু সাধারণ হাসপাতালের মাধ্যমে আসেননি এবং সেইসব রোগী ও চিকিৎসকদের সংস্পর্শে আসেননি, ফলে সম্প্রদায়িক স্তরে সংক্রমণ ছড়ানোর সুযোগ কম ছিল।

রোগটির বিস্তার রোধে কর্তৃপক্ষ উগান্ডা ও ডিআর কঙ্গোর মধ্যকার সীমান্ত বন্ধ করে দেন, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যকারী উগান্ডাবাসীদের ওপর আর্থিক প্রভাব ফেলতে পারে জেনেও।

উগান্ডা দ্রুত পদক্ষেপ নিলেও, ভাইরাসটির প্রতিক্রিয়া জানার ক্ষেত্রে তাদের একটি সুবিধা ছিল। ডিআর কংগোতে প্রথম ঘটনা শনাক্ত হওয়ার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইবোলা অলক্ষিতভাবে ছড়াচ্ছিল। তার কারণ ছিল স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ইবোলার সাধারণ প্রজাতি পরীক্ষা করছিলেন, কিন্তু বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বিরল প্রজাতি বুনদিবুগিওকে খুঁজছিলেন না। উগান্ডা ডিার কংগোতে বহু সংক্রমণ শনাক্ত ও প্রকাশ করার পরই নিজেদের প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত করে, ফলে প্রাদুর্ভাবের জ্ঞান উন্মক্ত ছিল এবং উগান্ডা দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

তুলনামূলকভাবে, ডিআর কংগোতে নজরদারি ও সংস্পর্শর শনাক্তকরণের কাজ বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল বুনিয়া শহর জুড়ে ভাইরাসটির অনুসরণকারী একজন ফিল্ড তদন্তকারী বার্তা সংস্থা রয়টার্স-কে বলেন, দুর্বল পরিকল্পনা, সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা এবং অনভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগের কারণে নজরদারি কাজ ব্যাহত হয়েছে। একইসাথে, পূর্ব ডিফ র কংগোয় চলমান অস্থিতিশীলতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি এবং লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুতি নজরদারিকে আরও দুরূহ করে তুলেছে। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল উগান্ডা প্রাদুর্ভাব চলাকালে ইবোলা আক্রান্ত হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের ৬,০০০-এরও বেশি সংস্পর্শককে কোয়ারেন্টিন করতে সক্ষম হয়েছিল। তাদের ২১ দিনের ইনকিউবেশন সময়কাল ধরে অন্তরিত করা হয়।

এটি প্রথমবার নয় যে কোনো স্বাস্থ্য সংকটে উগান্ডার প্রতিক্রিয়া নজর কেড়েছে। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে এইচআইভি ও এইডসের বিরুদ্ধে তাদের সফল অভিযান ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। প্রাদুর্ভাবের সময় সংক্রমণ প্রতিরোধে সম্প্রদায়ের সহযোগিতাও অপরিহার্য ছিল। সরকারি কথক কাগুয়্যা বলেন, 'আমি বলব আমাদের সাফল্যের পেছনে মূল কারণ আমাদের দ্রুততা ও পূর্ণাঙ্গ অনুসরণকরণ।'

উগান্ডা ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ ইবোলামুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছে, যদিও সর্বশেষ রোগী আরোগ্যলাভের ৪২ দিন পর প্রাদুর্ভাব সমাপ্ত ঘোষণার যে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক নিয়ম আছে, তারা তার আগেই এই ঘোষণা দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এই ঘোষণা দিতে পেরেছে কারণ প্রথম সংক্রমণটি ছিল আমদানি করা এবং কখনোই কোনো 'অব্যাখ্যাত সম্প্রদায়িক সংক্রমণ' ছিল না।

তারপরও, সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ থাকা ইতুরি প্রদেশের সাথে দীর্ঘ ও উন্মুক্ত সীমান্তের বাস্তবতা এই বোঝায় যে ভাইরাসটি সহজেই আবার উগান্ডায় পৌঁছতে পারে। সেই কারণে, উগান্ডা কয়েক ডজন স্বাস্থ্যকর্মীকে ডিন কংগোতে তাদের 'ভাই ও বোনদের' ইবোলা মোকাবিলায় সহায়তা করার জন্য পাঠিয়েছে। সরকারি মুখপাত্র কাজুয়্যা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, 'আমরা সেখানে যাচ্ছি যেখানে সমস্যা রয়েছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ব্যর্থ হলে উগান্ডা কখনোই ইবোলার বিরুদ্ধে জিততে পারে না।' উগান্ডা সীমান্তে পরীক্ষণ জোরদার করেছে এবং জনসাধারণকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বা রোগটি মোকাবিলার উপায় সম্পর্কে শিক্ষিত করছে। ডা. কাগ্ওয়া বলেছেন, 'আমরা সর্বদা খুব প্রস্তুত।'