ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানল অধ্যাপক মার্টা ইয়েব্রার কাছে যেন নিজের দেশের ঘটনা। স্পেনে জন্ম নেওয়া এই বিশেষজ্ঞ বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় অবস্থিত বুশফায়ার গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান। অস্ট্রেলিয়ার ভয়াবহতম অগ্নিকাণ্ড ‘ব্ল্যাক সামার’-এর প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি এখন দাবানল ঠেকাতে উপগ্রহ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অভিজ্ঞ অগ্নিনির্বাপকদের জ্ঞানের এক চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে।
ইয়েব্রার নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভিনব প্রকল্প অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী সম্প্রদায়ের হাজার বছরের পুরনো পরিবেশ জ্ঞানকে অত্যাধুনিক উপগ্রহ চিত্রের সঙ্গে মিলিয়েছে। উপগ্রহের তথ্য ভূ-প্রকৃতির ‘জ্বালানি আর্দ্রতা’র মাত্রা জানালেও, জমি কোথায়, কখন পুড়তে প্রস্তুত, তা বোঝার জন্য প্রয়োজন মাটি ও প্রকৃতির গভীর উপলব্ধি। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণ উপকূলে বেড়ে ওঠা অ্যাড্রিয়ান ওয়েবস্টারের মতো আদিবাসী বাস্তুবিদরা।
ওয়েবস্টার বোঝাতে চেয়েছেন, ইয়েব্রার দলের তথ্য ছিল অভূতপূর্ব, কিন্তু তার কোনো স্থানিক ভাষান্তর ছিল না, যা ব্যবহারের অযোগ্য বলে মনে হত। অথচ আদিবাসী দৃষ্টিকোণ থেকে তা একটি পথনির্দেশক মানচিত্রে পরিণত হয় যা কোনো স্থান জ্বালানোর জন্য প্রস্তুত কিনা তা বলে দিতে পারে। তারা শুধু উপরের নয়, মাটির নিচের স্তর থেকে গাছের শীর্ষ পর্যন্ত পুরোটা বিচার করেন। ইয়েব্রা বলেছেন, ওয়েবস্টারের স্থানীয় জ্ঞানের সাথে স্যাটেলাইট তথ্যের অসাধারণ মিল আবিস্কৃত হয়েছে, যা উভয় ধারার শিক্ষার মূল্য প্রমাণ করেছে।
দাবানল প্রতিরোধের আরেক প্রাচীন কৌশল হল ‘কুল ফায়ার’। ছোট, নিয়ন্ত্রিত আগুন জ্বালিয়ে জমিতে জ্বালানির ঘনত্ব কমানো হয়, যা একটি প্রকারের মোজাইক প্রতিকৃতি তৈরি করে। ইউরোপে এই সংস্কৃতি না থাকায়ই স্পেনের মতো দেশে আগুনে জ্বালানির আধিক্য ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনছে বলে মনে করছেন ইয়েব্রা। তিনি বিশ্বাস করেন, ইউরোপের উচিত অস্ট্রেলিয়ার এই প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং পূর্বানুমান ও দ্রুততর পদক্ষেপের কৌশলটি বোঝা ও আয়ত্ত করা।
ওয়েবস্টারও পরামর্শ দেন, ‘চুপ করে বসে না থেকে দ্রুত কাজ করা’ – এটাই বিশ্বের শেখার মতো মূল শিক্ষা। ‘যত বেশি ফেলে রাখবেন, জ্বালানি ততই বাড়ে এবং আগুন তখন বড় ও দমনে কষ্টকর হয়। আদিবাসীরা এটা বরাবরই জানতো, তাই তারা অনবরত নিয়ন্ত্রিত দহন চালিয়ে যেত যাতে বড় অগ্নির জন্য কোনো জ্বালানি জমতে না পারে।’
জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে শহরের প্রান্তে জঙ্গলের কাছাকাছি বাড়তি লোকজন বসতি গড়ায়, ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ এনএসডাব্লিউ-এর সুপারিন্টেন্ডেন্ট অ্যান্ড্রু শুরেটি জানান, ‘হ্যাজার্ড রিডাকশন বার্ন’ এখন তাদের প্রধান প্রশমন কৌশল। তবে শীতলকালেও বৃষ্টিপাতের ও দীর্ঘস্থায়ী আগুনের মৌসুমের প্রভাবে এই কার্যসীমিত সময়ের সীমা আরো ছোট হয়ে আসছে। ‘ব্যাকবার্নিং’ আরেক বহুল-স্বীকৃত কৌশল, যেখানে মূল অগ্নির আগে ইচ্ছাকৃতভাবে সামনের গাছপালা পুড়িয়ে তার বিস্তার রোধ করা হয়। এই পদ্ধতি এখন বিদেশেও দ্রুত গৃহীত হচ্ছে, যেমন কানাডার আলবার্টায় ২০২৪ সালে অস্ট্রেলীয় দমকলকর্মীদের আগমনের পর সেখানকার দল এটি নিজেদের অভিযানে কোনো দ্বিধা ছাড়াই গ্রহণ করে।
ড্রোন প্রযুক্তিও আধুনিক দাবানল মোকাবিলার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তাৎক্ষণিক আগুনের গতিপ্রকৃতি পরীক্ষা থেকে শুরু করে মাটিতে থাকা দলকে ভারী সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া এবং ব্যাকার্নিংয়ে আগুন শুরু করার কাজে এটি বিপ্লব এনেছে।
সামনে সম্ভাব্য সুপার এল নিনোর সতর্কতার মধ্যে ইয়েবরার কেন্দ্রের কাজ আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তার আশংকা, আসন্ন ফায়ার সিজনটি ভয়ানক রূপ নিতে পারে। ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের কান্ট্রি ফায়ার অথরিটির প্রধান জেসন হেফারান আরো শঙ্কিত। ২০০৯ সালের ব্ল্যাক স্টার্টার-পরবর্তী সময়ের স্মৃতি উসকে দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘এবারের গরমের জন্য আমরা অত্যন্ত গুরুতর কিছুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশই পুড়ে যাওয়ার জন্য তৈরি।’ তবে বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ নেওয়ার এখনই সময় বলে মনে করেন তিনি।
‘কোনো দমকল বাহিনী একা এটি পারে না, তাই আনুষ্ঠানিক ও আস্থাভিত্তিক জোট এবং আন্তর্জাতিক সম্পদ বিনিময় চুক্তিই মুখ্য।’ সহায়তা চাইবার সঠিক সময় নির্ধারণই হলো প্রধান চ্যালেঞ্জ। খুব দেরি হলে সুবিধা পাওয়া যায় না, আর খুব তাড়াতাড়ি চাইলে সম্পদের অপচয় হয়। মাত্র এই সপ্তাহেই ফ্রান্স তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ দাবানলের মোকাবেলায় প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার কাছে সাহায্য চেয়েছে। দুই ডজন ক্রু ও একাধিক বিমান মোতায়েন হবে।
হেফাান শেষ করেন, ‘বিশ্বব্যাপী দাবানল প্রতিরোধী সম্প্রদায় এখন আরো বেশি সংযুক্ত হচ্ছে।’ পূর্বে যেখানে কখবনো বুশফায়ার হয়নি, সেখানেও এখন তা ঘটছে। এই প্রেক্ষিতে অস্ট্রেলিয়ার নিজেদের পরিবেশ পোড়া নিয়তির নথিভুক্ত হয়ে, বিশ্বের জন্য এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছে।




