দক্ষিণ মরক্কোর ইমসোয়ানের একটি সার্ফিং সরঞ্জামের দোকানে কর্মরত ২৬ বছর বয়সী হামজা (ছদ্মনাম) জানান, দারিদ্র্যের অনিঃশেষ চক্র থেকে মুক্তির আশায় জীবনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করেননি তার শৈশবের বন্ধুরা। গত সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আফ্রিকার স্থলসীমানা স্প্যানিশ নগরী সেউতায় প্রবেশের চেষ্টাকারী প্রায় চার হাজার তরুণের মধ্যে ছিলেন তার ছয় বন্ধুও। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে হামজা বলেন, ‘স্পেনে যাওয়ার চেষ্টায় আমার বন্ধুরা মৃত্যুর মুখোমুখি হতে পারত। তারপরও তাদের কাছে সেই ঝুঁকে নেওয়াটাই সমর্থক মনে হয়েছে।’ তার ভাষায়, যাদের সাথে বেড়ে ওঠা হয়েছে, তাদের অনেকেই যেন ধীরে ধীরে অন্তর্ধান হয়ে যাচ্ছেন।

গত সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখে মরক্কোর বিভিন্ন শহর থেকে ছুটে আসা প্রায় তিন হাজার ব্যক্তি সীমান্তের বেড়া টপকানোর চেষ্টাকালে আটক হন বলে মরক্কো কর্তৃপক্ষ জানায়। এদিকে, পুরো পরিকল্পনায় জড়িত সন্দেহে প্রায় ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কয়েকজন আলজেরীয় কর্মীর সম্পৃক্ততাার অভিযোগ তোলা হয়, যদিও আলজেরিয়া তা অস্বীকার করে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আলী জুবেইদির মতে, এটি ছিল ব্যতিক্রমী এক দৃশ্যপট। আগে যেখানে সাবসাহারা আফলিকান অভিবাসীরা এ ধরনের প্রচেষ্টা চালাত, সেখানে ওই সময় অংশগ্রহণকারীদের সিংহভাগই ছিলেন মরক্কোর নাগরিক এবং তাদের অনেকেই মাসে ৪ থেকে ৫ হাজার দিরহাম আয়ের মতো চাকরিও করতেন। তিনি মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের মূলে ছিল চরম হতাশা ও অসন্তোষ।

সেউত সীমানা নিকস্থ এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশের বাসিন্দা ১৭ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী বুশরা আবজাইউ জানান, কোভিড-১৯ অতিমারির পরকার হতাশাই তরুণদের ইউরোপগামীত ঝুঁকিপূর্ণ পথের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মরক্কোর নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক খালিদ মুনা এ প্রতিক্রিয়াকে নিছক স্বপ্ন নয়, বরং “একধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ” হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর ভাষ্য, “জনপরিসরে দমন-পীড়নের মুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের একত্র হাওয়ার ক্ষমতাশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।”

সামাজিক মাধ্যমের রঙিন চিত্র ও বাস্তবতার বিশাল ফারাকের কথাও জানান হামজা। সীমান্ত পার হয়ে ইউরোপে পৌঁছানো বন্ধুরা সেলফি আর পার্টির ভিডিও পোস্ট করলেও রাস্তায় রাত যাপনের কঠিন বাস্তবতা গোপন রাখেন। হামজার এক বন্ধু, যিনি একজন ফুটবলার, প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বৈধ কাগজের অভাবে স্পেনের ক্লাবগুলোতে সুযোগ পাচ্ছেন না। সেউতায় অবস্থানরত ১৭ বছর বয়সী কিশোর ইব্রাহিম (ছদ্মনাম) জানায়, ফেনিদেকের বাসিন্দা হয়ে প্রতিদিনের সীমান্ত পরিস্থিতি প্রত্যখ করাই তার সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার অনুপ্রেরণা। সাত কিলোমিটারের দুরত্বপারী হওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা স্মরণ করে সে বলে, “মনে হচ্ছিল জীবনের সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে, মায়ের কথা বারবার মনে পড়ছিল।”

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২৩ সালের তথ্যমতে, মরক্কোর ৬.৪ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্রে মধ্যে বসবাস করে, এবং কোভিড-১৯ এর ধাক্কায় আরও ১০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্রকের সম্মুখীন হয়। ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির বেকারত্বের হার দাঁড়ায় ১৩.৬ শতাংশে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তা ও অভিবাসন ঠেকাতে মরক্কোর সাথে চুক্তি সমালোচিত হচ্ছে, কারণ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ— ইউরোপ জেনেশুনেই মরক্কোকে মানবাধিকার লঙনের ঝুঁকিতে ফেলছে। এদিকে, হামজা বৈধ শিক্ষার্থী ভিসায় ইউরোপে পড়াশোনার পরিকল্পনা করছেন, কিন্তু তিনি জানেন তার বন্ধুদের জন্য সেই পথ খোলা নয়।

একটি অলভ্যিক আবহে স্পেনের সেউতা ও মেলিল্লা হয়ে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার এই আকুতি শুধু আর্থিক সমস্যাই নয়, বরং একটি প্রজন্মের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর প্রতি গভীর অসন্তোষ ও বিক্ষোভেরই প্রতিফলন।