২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দীদের মধ্যে ৬৯০ জন এখনো পলাতক রয়েছেন। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানিয়েছেন, নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো ১৬৬ জনের কোনো তথ্য এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কারাগারের তথ্য ও সার্ভার পুড়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি। তবে অন্যান্য পলাতকদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাদের নামে মামলা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আইজি প্রিজন।
মঙ্গলবার দুপুরে পুরান ঢাকার বকশীবাজার-সংলগ্ন উমেশ দত্ত রোডে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কারাগারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন কার্যক্রম ও সংস্কার নিয়ে কথা বলেন তিনি। কারাগারে থাকা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মুঠোফোনসহ কোনো অবৈধ সুবিধা ভোগ করছেন কি না—সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন বলেন, অবৈধ মুঠোফোনের ব্যবহার ঠেকাতে গত এক বছরে বিভিন্ন কারাগার থেকে প্রায় তিন হাজারের বেশি মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে এক হাজারের বেশি কারারক্ষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শুরুর দিকে অবৈধ মুঠোফোনের সংখ্যা বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে তা কমে এসেছে বলে মন্তব্য করেন আইজি প্রিজন। কোনো কারারক্ষী বা অন্য কেউ অবৈধভাবে মুঠোফোন ঢোকানোর সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। কারাগার নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা চলছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রায় ৬০টি কারাগার পরিদর্শন করেছেন। এসব সফরে জেল সুপারদের উপস্থিতির বাইরে বন্দীদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তিনি।
খাবার ও ক্যানটিন প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন জানান, কারাগারের খাবারের পরিমাণ নিয়ে বর্তমানে তার কাছে কোনো অভিযোগ নেই। বিভিন্নভাবে তদন্ত করে তারা দেখেছেন, বরাদ্দের পুরো চাল রান্না করলে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়। এ কারণে চালের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সকালের রুটি, সবজি, মাছ ও তরকারির বিষয়ে তিনি বলেন, শক্ত হওয়া ছাড়া বাকি খাবার তার দৃষ্টিতে পর্যাপ্ত। তবে খাবারের স্বাদ নিয়ে অভিযোগ আছে। বন্দীদের দিয়েই রান্না করানো হয় বলে দক্ষতার অভাবে অনেক সময় খাবারের স্বাদে সমস্যা হতে পারে। এ কারণে মসলা বাড়ানোর প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে।
আইজি প্রিজনের ভাষ্য, আগে বাইরে থেকে রান্না করা খাবার বা বাসা থেকে খাবার কারাগারে যাওয়ার অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তা হচ্ছে না। প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ হাজার বন্দী এই ব্যবস্থার খাবার গ্রহণ করছেন। আর্থিকভাবে সক্ষম বন্দীদের জন্য কারাগারের ক্যানটিন থেকে সীমিত পরিমাণে বিভিন্ন জিনিস কেনার সুযোগ আছে। ক্যানটিনে অতিরিক্ত দামের অভিযোগের বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, কেন্দ্রীয় দলের মাধ্যমে দাম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। কোথাও অতিরিক্ত দাম বা অব্যবস্থাপনা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা বাড়াতে বন্দীদের জন্য নির্ধারিত পণ্যের দাম বড় অক্ষরে টাঙানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, ক্যানটিনের লেনদেনে ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এতে বন্দী তার আরএফআইডি ও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন ও কেনাকাটা করতে পারবেন। ফলে পুরো লেনদেনের রেকর্ড থাকবে। মুন্সিগঞ্জে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও তা চালুর পরিকল্পনা আছে। সরকারি অতিরিক্ত অর্থ ছাড়াই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে এটি করা হচ্ছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কারাগার প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন বলেন, কারাগারে মাদক প্রবেশের বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার বন্দী মাদকসংক্রান্ত মামলায় কারাগারে আছেন। তাদের বড় একটি অংশ মাদকসেবী। মাদক না পেলে তাদের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কেউ সহিংস আচরণ করছেন, আবার কেউ কথা শুনছেন না। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফেনী-২ ও কিশোরগঞ্জে দুটি মাদক বিশেষ কারাগার চালু করা হয়েছে। সম্প্রতি কাশিমপুরের একটি কারাগারকেও মাদক বিশেষ কারাগার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কারাগারে শুধু মাদকসংক্রান্ত মামলার বন্দীরা থাকবেন। তাদের জন্য শারীরচর্চা, কাউন্সেলিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলাসহ আলাদা রুটিন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবেদনশীল বন্দীদের বিশেষায়িত জোনে রাখা হয়েছে জানিয়ে আইজি প্রিজন বলেন, এসব এলাকায় ব্যাপক জ্যামিং ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো কারণে মুঠোফোন কারাগারে ঢুকলেও সেখানে তা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। তৃতীয় লিঙ্গের বন্দীদের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের সাধারণ ওয়ার্ডে না রেখে আলাদা জোন, সেল বা বিভিন্ন স্থানে রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তাদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড বা বিশেষ জোন তৈরির বিষয়টি ভাবতে হবে। কারা ব্যবস্থাপনায় এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কারাগারে চিকিৎসক সংকট প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন জানান, অনুমোদিত ১৫১টি পদের মধ্যে মাত্র দুজন চিকিৎসক পদায়িত আছেন। অন্য কারাগারগুলোতে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে চিকিৎসক পাওয়া যায়। বর্তমানে বিভিন্ন কারাগারে ১০১ জন চিকিৎসক অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন। চিকিৎসকের স্বল্পতার কারণে ফার্মাসিস্ট ও ডিপ্লোমা নার্সদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সম্প্রতি পিএসসি থেকে ৫৫ জন নার্সের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। তারা শিগগিরই যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আইজি প্রিজন জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে কারাগারে ১৮৬ বা ১৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১২২ জনের মৃত্যুর তালিকা আছে। বর্তমানে ১২২ জন বন্দী কারাগারের বাইরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত সাত মাসে ৫৬ হাজার বন্দীকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, কোনো বন্দী অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। গভীর রাতেও জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশ স্কোয়াড পাওয়া না গেলে নিজেদের স্কোয়াড দিয়ে বন্দীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্সের স্বল্পতার কারণে কখনো কখনো হাসপাতালে নেওয়ার পথেই বন্দীর মৃত্যু ঘটে। বন্দীর মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করা হয়। প্রয়োজন হলে ফরেনসিক পরীক্ষা করে তা নথিবদ্ধ করা হয়।
বন্দীর সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯৮ হাজার হয়েছে উল্লেখ করে আইজি প্রিজন বলেন, আগে গড়ে প্রায় ৮০ হাজার বন্দী নিয়ে কারাগার পরিচালিত হলেও বর্তমানে প্রায় ৯৮ হাজার বন্দী আছেন। প্রতিদিনই বন্দীদের আসা-যাওয়া চলছে। গতকাল সোমবার ২ হাজার ৭৯৬ জন বন্দী কারাগারে এসেছেন এবং ৩ হাজার ৪৯ জন বের হয়েছেন। গত ১ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতে ২৬ হাজারের বেশি আসামি দণ্ডিত হয়ে কারাগারে এসেছেন। এক দিন থেকে শুরু করে পাঁচ দিন, সাত দিন, এক মাস বা তিন মাসের মতো অল্প মেয়াদের সাজা পাওয়া এসব বন্দী কারাগারের সংখ্যা বাড়ানোর অন্যতম কারণ উল্লেখ করে আইজি প্রিজন বলেন, বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে।
নতুন কারাগারগুলোতে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপন নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে কিছু পুরোনো কারাগারে এসটিপি থাকার পরও সেগুলো সচল নেই। স্থানীয় একটি কোম্পানি ও একটি কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে এসব এসটিপি পুনরায় চালুর কাজ চলছে। পুরোনো কারাগারগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পুরোনো অনেক কারাগার আশপাশের এলাকার তুলনায় নিচু হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এসব কারাগার সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে উচ্চতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
‘জামিন–বাণিজ্য’ বা মুক্তি–বাণিজ্যের পুরোনো অভিযোগের বিষয়েও কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন আইজি প্রিজন। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে বসে বিষয়টি কীভাবে আরও নিয়মতান্ত্রিক করা যায় তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বেল বন্ড যাচাইসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কিছু প্রক্রিয়া থাকায় সময় লাগে। তবে অযাচিতভাবে কাউকে আটকে রাখা যাতে না হয় সে বিষয়ে কাজ চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দী আছেন। তাদের মধ্যে সাজা শেষ করে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন ১৭০ জন। তাদের নিজ নিজ দূতাবাস, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। বিদেশি বন্দীদের মৃত্যুর পর মরদেহ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়েও তথ্য দেন আইজি প্রিজন। গত দুই বছরে প্রায় ১৭টি এমন মরদেহের ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বা দুটি মরদেহ ভারতে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে তিনটি মরদেহ বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আছে। সরকারি সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো নিষ্পত্তি করা হবে।
কারাগারে ৭৫ শতাংশই বিচারাধীন মামলায় বন্দী হয়ে আছেন বলে জানান আইজি প্রিজন। গত পাঁচ বছরে প্রায় আড়াই লাখ বন্দীকে ৩৯টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের অনেকে সেলাই মেশিন, কম্পিউটার সরঞ্জাম, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়েছেন, যাতে বাইরে কাজ করতে পারেন। নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জে দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং লাইন রয়েছে। সেখান থেকে কারাগারের নিজস্ব পোশাকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করা হচ্ছে।
কারাগারে সাবান তৈরির স্বয়ংক্রিয় কারখানা করা হয়েছে এবং স্বয়ংক্রিয় ওয়াটার বটলিং কারখানা করার পরিকল্পনা আছে। ভবিষ্যতে কারেকশনাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক করা গেলে বন্দীদের দক্ষতাকে আরও কাজে লাগানো সম্ভব হবে। সরকার বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ স্কুলশিক্ষার্থীর পোশাক দেওয়ার পরিকল্পনা করছে উল্লেখ করে আইজি প্রিজন বলেন, কারাগারের গার্মেন্টস লাইনে এসব পোশাক তৈরি করা সম্ভব কি না তা যাচাই করতে তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত দুই বছরে কারা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয়ে ৩০০টির বেশি নীতিপত্র তৈরি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কারাগারে বিভিন্ন অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ চলছে। সবকিছু ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে গেছে তা নয়। তবে গ্রহণ করা পদক্ষেপগুলো অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ জেল আর পিছিয়ে যাবে না; বরং সামনে এগিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।




