আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ রাজধানী ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র চার কিলোমিটারে নেমে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতির চেয়েও কম হবে এই গতি। এর ফলে যানজটের কারণে প্রতি বছর রাজধানীতে প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলামোটরে বিআইপি কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা: চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পিত সমাধানের পথরেখা’ শীর্ষক প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংগঠনটির সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, আর সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান। প্রবন্ধে ঢাকার বাসযোগ্যতা নির্ধারণের ১০টি প্রধান সূচক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পরিবেশদূষণ, যোগাযোগব্যবস্থা, নাগরিক সুবিধা, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, বর্জ্য ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। বিশ্বব্যাংকের ২০১৭ সালের সমীক্ষার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, সে সময় ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় সাত কিলোমিটার।

প্রবন্ধে আরও উঠে আসে, ঢাকায় গণপরিবহনে চলাচলের সময় প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী হয়রানির শঙ্কায় থাকেন। বিদ্যমান গণপরিবহনব্যবস্থা প্রবীণ ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের ব্যবহারের উপযোগী নয় বলেও উল্লেখ করা হয়। বায়ুদূষণের প্রায় ৮৫ শতাংশের জন্য দায়ী ইটভাটা, রাস্তার ধুলা ও যানবাহনের নির্গত ধোঁয়া। রাজধানীর ৫৬টি খালের মধ্যে ২৬টিরই বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে জলাবদ্ধতার মূল কারণ বৃষ্টি নয়, বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণ বলে মন্তব্য করা হয়। ঢাকার ড্রেনেজ চ্যানেলগুলোও বৈজ্ঞানিক নেটওয়ার্কভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াই বিচ্ছিন্নভাবে তৈরি হয়েছে বলেও প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিদিন শহরে উৎপন্ন বর্জ্যের চার ভাগের এক ভাগ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, উচ্চ জনঘনত্ব, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, জলাবদ্ধতা ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। খালি জায়গায় অবাধে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠায় শিশুদের খেলার মাঠ দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ছে।

ঢাকার বাসযোগ্যতার সংকটকে ‘আন্তসম্পর্কিত কাঠামোগত ব্যর্থতার সমষ্টি’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিআইপি সাত দফা সুপারিশ প্রস্তাব করেছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক পরিবর্তনেও চলমান পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রক্ষা, বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিস্বার্থে পরিকল্পনার মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন না করা এবং পাঁচ বছর পরপর বিভিন্ন অংশীজনকে নিয়ে পরিকল্পনার অগ্রগতি ও প্রতিবন্ধকতা পর্যালোচনা। এছাড়া সমন্বিত জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাধ্যতামূলক ‘পরিকল্পনা সামঞ্জস্য প্রতিবেদন’ গ্রহণ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মধ্যে না রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

বিআইপির সভাপতি আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে ৫৫ বছর পিছিয়ে আছি। স্বাধীনতার পরেই যে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা আমাদের থাকা প্রয়োজন ছিল, সেটা এখনো প্রণীতই হয়নি। সেই স্থানিক পরিকল্পনা যখন হবে এবং তার আলোকে আমরা কাজগুলো করব, তখন এই ঢাকার বাসযোগ্যতা নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে না।’ সাবেক সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ঢাকায় খেলার মাঠগুলোর বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে গেছে। যাদের টাকা আছে তারা খেলতে পারছে। গরিব বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের খেলার সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নদী দখল হয়ে যায়, খাল দখল হয়ে যায়, বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পগুলো মাইলের পর মাইল জলাভূমি দখল করে। সরকারের বিভিন্ন বাহিনী কী করে? জলাভূমি, জলাশয় দখলকারীদের উচ্ছেদ করা যায় না। রাষ্ট্রের যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সেটা যদি আমরা দেখাতে না পারি তাহলে ঢাকার বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’ সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন নগর–পরিকল্পনাবিদ এ কে এম রিয়াজ উদ্দিন ও তালহা তাসনিম।