পবিত্র কুরআনের সুরা মায়িদার দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা করো। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।’ বর্তমান সময়ে যখন ভালো কাজের পরিমাণ কমছে এবং অসৎ কাজ ছড়িয়ে পড়ছে, তখন এই নির্দেশনা মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে গেছে বলে ইসলামী পণ্ডিতরা মনে করেন। কল্যাণ বৃদ্ধি, অকল্যাণ সীমিত রাখা, ধর্মীয় কাজ প্রতিষ্ঠা, সংস্কারকদের শক্তিশালী করা এবং ফ্যাসাদকারীদের ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের জন্যই এই সহযোগিতা অপরিহার্য।
উক্ত আয়াতে সৎকর্ম বোঝাতে ‘বির’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ‘বির’ ও ‘তাকওয়া’ শব্দ দুটি ইসলাম ও ইমানের মতোই একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ইমাম কুরতুবি (রহ.)-এর মতে, বির ও তাকওয়া মূলত একই অর্থ বহন করে। প্রতিটি বিরই তাকওয়া এবং প্রতিটি তাকওয়াই বির। তবে সূক্ষ্মভাবে বলতে গেলে, বির বলতে ফরজ ও মুস্তাহাব উভয় প্রকার কাজকে বোঝানো হয়, আর তাকওয়া বলতে শুধু ফরজ কাজ পালনকে বোঝানো হয়। শাইখ সাদি (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন যে, ‘বির’ একটি ব্যাপক শব্দ যা আল্লাহর পছন্দ ও সন্তুষ্টির সব কাজ—প্রকাশ্য বা গোপন, আল্লাহর হক বা বান্দার হক—অন্তর্ভুক্ত করে। অন্যদিকে তাকওয়া হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যা অপছন্দ করেন, তা প্রকাশ্যে ও গোপনে বর্জন করা। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, বির হলো লক্ষ্য এবং তাকওয়া হলো সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ ও মাধ্যম।
এই আয়াতে সহযোগিতা বোঝাতে ‘ইয়ানাহ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ সাহায্য, সমর্থন ও পক্ষে দাঁড়ানো। আলেমদের ব্যাখ্যা অনুসারে, জ্ঞান ও কাজ উভয় দিক থেকেই একে অপরকে সহযোগিতা করতে হবে। সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ (রহ.)-কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এর অর্থ হলো নিজে সেই কাজ করা, অন্যকে তার দিকে ডাকা, তাতে সহায়তা করা এবং পথ দেখানো। ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন, অর্থাৎ তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো, আল্লাহর নির্দেশিত কাজে উৎসাহ দাও এবং তা পালন করো, আর আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো ও অপরকেও বিরত রাখো। এটি নবীজি (সা.)-এর সেই হাদিসের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ—‘যে ভালো কাজের পথ দেখায়, সে যেন নিজেই তা করল।’
সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিমরা যখন এতে সহযোগিতা করে, তখন তারা আল্লাহর হুকুম মেনে চলে এবং রাসুলের আনুগত্য করে। এই সহযোগিতার মাধ্যমেই এমন সব লক্ষ্য ও প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, যা একা করতে গেলে সম্ভব হতো না। দায়িত্বও বহু মানুষের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় এবং মুসলিমদের মধ্যে ভালোবাসা ও একতা বৃদ্ধি পায়। নবী-রাসুলরা পর্যন্ত আল্লাহর কাছে সহায়ক চেয়েছেন। মুসা (আ.) বলেছিলেন, ‘আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে স্পষ্টভাষী, তাকে আমার সহায়করূপে পাঠান, যে আমাকে সত্যায়ন করবে।’ আল্লাহ তাঁর এই প্রার্থনা কবুল করে বলেন, ‘আমি তোমার ভাইয়ের মাধ্যমে তোমার শক্তি বাড়িয়ে দেব।’ ইসা ইবনু মারিয়াম (আ.) হাওয়ারিদের বলেছিলেন, ‘আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে।’ নবীজি (সা.) বিভিন্ন মেলায় ও হজের মৌসুমে গোত্রে গোত্রে গিয়ে বলতেন, ‘কে আমাকে আশ্রয় দেবে? কে আমাকে সাহায্য করবে, যাতে আমি আমার রবের বার্তা পৌঁছে দিতে পারি? তার জন্য জান্নাত রয়েছে।’ এই আশ্রয়দানও ছিল নেকি ও তাকওয়ায় সহযোগিতার একটি রূপ, যার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন আনসাররা।
এই সহযোগিতার পরিসর অত্যন্ত বিস্তৃত। ‘বির’ বলতে আল্লাহর পছন্দের সব কাজ বোঝায়, তাই সেসব কাজে সহযোগিতা করা, প্রতিষ্ঠা করা এবং টিকিয়ে রাখা এই সহযোগিতার অংশ। আবার তাকওয়া মানে আল্লাহর অপছন্দের সব কাজ বর্জন করা, তাই এই বর্জনে একে অপরকে সাহায্য করাও এর অন্তর্ভুক্ত। দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া, উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আচরণের দিকে আহ্বান জানানো, ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা এবং ধর্মীয় নিদর্শনগুলোকে সম্মান করা—সবই এই সহযোগিতার আওতাভুক্ত। আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর সম্মান রক্ষা করে, তা তার প্রতিপালকের কাছে তার জন্য কল্যাণকর।’ আরও বলেন, ‘যে আল্লাহর নিদর্শনগুলোর সম্মান করে, তা তো অন্তরের তাকওয়া থেকেই আসে।’
মসজিদ নির্মাণ, ইসলামি আলোচনার আয়োজন, জ্ঞান বিতরণ, অজ্ঞ মানুষকে শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের কষ্টদায়ক আচরণে ধৈর্য ধরা—এসবও এই সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। দরিদ্র মুসলিমদের সেবায় দাতব্য হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলাও এরই একটি রূপ। দরিদ্র ছাত্র, আলেম ও দাঈদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া এবং তাদের পড়াশোনা ও দাওয়াতের কাজে মনোনিবেশের সুযোগ করে দেওয়াও এতে পড়ে। ওমর (রা.) ও তাঁর আনসারি প্রতিবেশী আউস ইবনু খাওলির মধ্যকার জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখযোগ্য। তারা পালা করে নবীজির কাছে যেতেন এবং একে অপরকে শোনা হাদিস জানাতেন। আবু মুসা আশআরি (রা.) এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন, তোমরা লক্ষ করো, বুঝেশুনে নামাজ প্রতিষ্ঠিত করো, তাতে আল্লাহকে ভয় করো, একে অপরকে সহযোগিতা করো, একে অপরকে নসিহত করো। কেউ কিছু ভুলে গেলে বা অসতর্ক হলে তা মনে করিয়ে দাও। কারণ, আল্লাহ তোমাদের নেকি ও তাকওয়ায় সহযোগিতা করতে বলেছেন, আর নামাজই তো সর্বোত্তম নেকি।’
সংক্ষেপে বলা যায়, এই ছোট্ট আয়াতটি প্রতিটি সুন্দর ও ভালো কাজে সহযোগিতার নির্দেশ একসঙ্গে ধারণ করে রেখেছে। মুসলিমদের হক আদায়ে সহযোগিতার পরিসর এত বিশাল যে এতে অসংখ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত। ঐক্যই মুসলিম উম্মাহর সৌন্দর্য এবং এই ঐক্য বজায় রাখতে সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।




