রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে সোমবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হলো ‘প্রমিত স্টাইল গাইড বক্তৃতা-৩’ শীর্ষক সেমিনার। আইসিটি বিভাগের ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ প্রকল্পের উদ্যোগে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এই আয়োজন করে। সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, যিনি ‘বাংলা ভাষা: পরিভাষা, প্রতিবর্ণ, ফন্ট’ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

তাঁর বক্তৃতায় সাজ্জাদ শরিফ উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পরপরই যে আশা করা হয়েছিল উচ্চশিক্ষা বাংলা মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বই বাংলায় অনূদিত হবে, সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা এখনও মূলত ইংরেজি মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, ফলে বাংলা পরিভাষার বিকাশ প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। এটি জাতীয় জীবনের জন্য একটি বড় পশ্চাৎপদতা বলে উল্লেখ করেন তিনি।

একই শব্দের জন্য বর্তমানে বাংলাদেশে একাধিক পরিভাষা ব্যবহৃত হওয়ায় পাঠকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন সাজ্জাদ শরিফ। উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও একটি স্থায়ী ভাষাতাত্ত্বিক কমিশন বা বডি গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই সংস্থাটি নিয়মিত নতুন শব্দ ও পরিভাষা নথিভুক্ত করবে এবং প্রমিত মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।

সেমিনারে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম পাঠ্যপুস্তকের ভাষা সংস্কারের দিকটিতে গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর অভিযোগ, নবম-দশম শ্রেণির ধর্মীয় পাঠ্যপুস্তকের ভাষা এখন অনেকাংশেই ক্ষতিগ্রস্ত। তিনি বলেন, আগে এসব বই ছিল অত্যন্ত সুলিখিত এবং মানসম্পন্ন, কিন্তু বর্তমানে কৃত্রিমভাবে সরাসরি আরবি শব্দ সংযোজনের কারণে ভাষার স্বাভাবিক রূপটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে আরবি শব্দগুলো যে ফারসি ও হিন্দুস্তানির মধ্য দিয়ে বাংলায় এসেছে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মোহাম্মদ আজম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ধ্বনিগত ও রূপগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এগুলো বাংলার সঙ্গে দারুণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, যা এখন হারিয়ে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন ‘বাংলা স্টাইল গাইড’-এর নির্বাহী সম্পাদক মামুন অর রশীদ। তিনি জানান, ভাষা ও প্রযুক্তির বিভিন্ন প্রমিত মান তৈরিতে বিসিসি নিরলস কাজ করছে। রোমানাইজেশন, ট্রান্সক্রিপশন ও ফন্টের প্রমিত মান নির্ধারণে ভাষাবিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপকদের অংশগ্রহণে এই ধারাবাহিক বক্তৃতার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী সেশনে জ্যাকব থমাস বাংলা ফন্ট এবং ড. আহমদ শামীম বাংলা ট্রান্সক্রিপশন বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।

স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহবুব করিম। সেমিনারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অনুবাদের নৈতিকতা প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের ‘দুধের বাটি’র উপমা টেনে বলেন, বিড়ালের সামনে যেমন দুধ রাখলে লোভ সামলানো কঠিন, তেমনি সহজ মাধ্যম পেলে মানুষ এআই-এর দিকেই ঝুঁকে পড়বে। তবে সম্পূর্ণ অনুবাদ এআইয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাথমিক অনুবাদ নিজে করার পর সম্পাদনা বা পরিমার্জনের কাজে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে। নিজের ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের লেখার গভীর সাধনার কথাও স্মরণ করেন।

উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণকারীরা পাঠ্যপুস্তকের ভাষা সংস্কার এবং ধর্মীয় পাঠ্যবইয়ের ভাষাগত বিবর্তন নিয়ে নিজ নিজ মতামত প্রকাশ করেন। সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন ইবিএলআইসিটি প্রকল্পের পরিচালক মাহবুব করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মৃধা মো. শিবলী নোমান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সৌমিত জয়দীপ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম, বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সায়েরা হাবীব, ইউপিএলের সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ, বাংলা উইকিপিডিয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর নাহিদ সুলতান এবং উইকিমিডিয়ার নির্বাহী সদস্য শাবাব মুস্তফা।