চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা দিয়েছে চরম নিম্নমুখী প্রবণতা। দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে উচ্চ পাসের হার ছিল বলে পরিচিত হলেও, টানা দ্বিতীয় বছর ধরে সেই ধারা ভেঙে পড়েছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সমন্বিত ফলাফলে এবার পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা গত ১৯ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। শুধু পাসের হারই নয়, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাতেও দেখা দিয়েছে বড় পতন; এবার মোট ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন শিক্ষার্থী এই সর্বোচ্চ সূচক অর্জন করেছে, যেখানে গত বছর ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মোট ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জনের মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। অর্থাৎ ৫ লাখ ৪ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি, যা মোট পরীক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। এই বিপুল সংখ্যক অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবার ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজনও শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৪৮টি। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল বিদ্যালয়ভিত্তিক শিখন মান এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির গভীর ঘাটতিরই ইঙ্গিত দেয়।
সার্বিক ফলাফলে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে ইংরেজি ও গণিতের খারাপ ফল। কুমিল্লা বোর্ড বাদে বাকি আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ; অপরদিকে সিলেট বোর্ডে ইংরেজিতে প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এমনকি সেরা ফল দেখানো ঢাকা বোর্ডেও ইংরেজিতে আগের বছরের তুলনায় ফল খারাপ হয়েছে, সেখানে এবার পাসের হার ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি, যা গত বছর ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করার কারণেই মূলত পাসের হার কমেছে। যেহেতু এই দুটি বিষয় বাধ্যতামূলক, তাই এসব বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সরাসরি সামগ্রিক ফলাফলের উপর পড়েছে।
বিভাগভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণেও বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফলাফল সবচেয়ে খারাপ হয়েছে, যেখানে ছাত্রদের পাসের হার প্রায় ৪১ শতাংশ এবং ছাত্রীদের প্রায় ৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৭৭ শতাংশের বেশি এবং ছাত্রীদের প্রায় ৮৪ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ফলও মানবিকের চেয়ে ভালো। মানবিক বিভাগে যেহেতু পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি, তাই এই বিভাগের দুর্বল ফল সামগ্রিক পাসের হারকে বড়ভাবে টেনে নামিয়েছে। দুই দশকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৫৭ শতাংশ; পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭১ শতাংশে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে এই হার ৮০ শতাংশের উপরে বা কাছাকাছি ছিল, কোনো কোনো বছর ৯০ শতাংশও ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু গত বছর থেকে সেই ধারা বদলে গেছে। এখন টানা দুই বছর ধরে ফল কমছে, যা মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং বিদ্যালয় পর্যায়ের শিখনঘাটতি—সবগুলো বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবার তাগিদ দিচ্ছে।
তবে এই ফলাফলকে খারাপ বলে মানতে নারাজ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গতকাল ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এবারের ফল সুন্দর হয়েছে। পাশাপাশি তিনি মন্তব্য করেন, 'মন খুলে গান গাওয়া যায়, পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়া যায় না।' একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, এবারের পরীক্ষার উত্তরপত্র নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে প্রতিটি শিক্ষার্থী যেভাবে পড়াশোনা করেছে, সেভাবেই তার মূল্যায়ন হয়েছে। গত ৩০ বছরের ফলাফলের ধারা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। নব্বই দশকের শুরুর দিকে বহুনির্বাচনী প্রশ্নপদ্ধতি চালুর পর ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসে; ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পাসের হার ছিল ৬১ থেকে ৭৩ শতাংশের মধ্যে। পরে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তা আবার কমে যায়। ২০০৮ সাল থেকে পুনরায় বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার মধ্যে মাধ্যমিকে চালু হয় সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি, যা এখনও বহাল আছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, শুধু পাস-ফেলের হিসাব নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার গভীর বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।




