বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কোয়ান্টাম মেকানিকসের অন্যতম প্রধান কারিগর আরউইন শ্রোডিঙ্গার। মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে তাঁর দেওয়া 'তরঙ্গ সমীকরণ' বিজ্ঞানের ইতিহাসের দশটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণের একটি হিসেবে স্বীকৃত। ১৮৮৭ সালের ১২ আগস্ট অ অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জন্মগ্রহণ করেন শ্রোডিঙ্গার। কাপড়ের কলের মালিক রুডল্ফ শ্রোডিঙ্গার এবং জর্জিন শ্রোডিঙ্গারের একমাত্র সন্তান তিনি। শৈশব থেকেই বাবার সাথে বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে আলোচনা এবং মায়ের মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। প্রাথমিক শিক্ষার পর ১৮৯৮ সালে ভিয়েনার জিমনেশিয়ামে ভর্তি হন এবং ১৯০৬ সালে উচ্চ-মাধ্যমিক সমতুল্য ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সেখানে শিক্ষক লুডভিগ বোলজম্যানের আত্মহত্যা এবং পরবর্তীতে অধ্যাপক ফ্রেডরিক হাসনলের যুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান পদ্ধতি শ্রোডিঙ্গারের চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯১০ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করে সামরিক সেবা শেষ করে তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে যোগ্যতার তুলনায় নিম্নপদে কাজ করার কারণে তিনি মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যান। ১৯১৩ সালে আইনস্টাইনের একটি বক্তৃতা তাঁকে মহাকর্ষ ও বিদ্যুৎচুম্বক বলের সমন্বয় নিয়ে গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে থেকেও তিনি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের পাঠ গ্রহণ করেন। যুদ্ধের পর জার্মানির ইনা এবং স্টুটগার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এরই মাঝে ১৯১৯ সালে মা-বাবাকে হারান এবং ১৯১৮ সালে আনামেরি বার্টেলকে বিয়ে করেন। এরপর তিনি জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং সেখানে থাকাকালীনই তাঁর শারীরিক অসুস্থতা (যক্ষা) তাঁকে গবেষণায় আরও নিবিষ্ট করে তোলে। ১৯২৫ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত তরঙ্গ সমীকরণটি তৈরি করেন এবং ১৯২৬ সালে তা প্রকাশ করেন। তাঁর এই আবিষ্কার হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স মেকানিকসের একটি ভিন্ন গাণিতিক রূপ ছিল।
১৯২৭ সালে তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের প্রধান অধ্যাপক হন। তবে ১৯৩৩ সালে নাৎসি শাসন ক্ষমতায় আসার পর ইহুদি সহকর্মীদের প্রতি অত্যাচারের প্রতিবাদ করায় তাঁর জীবন ও পেশা হুমকির মুখে পড়ে। ১৯৩৩ সালেই কোয়ান্টাম মেকানিকসে অসামান্য অবদানের জন্য পল ডিরাকের সাথে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাঁকে অস্ট্রিয়া ও জার্মানি ছেড়ে প্রথমে অক্সফোর্ড, পরে ইতালি এবং অবশেষে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে চলে যেতে হয়। ডাবলিনের ইন্সটিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের নেতৃত্বে থাকাকালীন তিনি পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি জীববিজ্ঞানেও আগ্রহ দেখান। ১৯৪৪ সালে তাঁর লেখা 'হোয়াট ইজ লাইফ?' বইটি অণুজীববিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিককে অনুপ্রাণিত করে, যা পরবর্তীকালে ডিএনএ আবিষ্কারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি একটি 'ইউনিফাইড থিওরি' আবিষ্কারের দাবি করেন, তবে আইনস্টাইন সেই তত্ত্বে ভুল ধরিয়ে দিলে শ্রোডিঙ্গার গভীর লজ্জিত হন। এরপর তিনি পদার্থবিজ্ঞান থেকে দূরে সরে ভারতীয় দর্শন এবং উপনিষদের চর্চায় মগ্ন হন। ১৯৫৬ সালে ভিয়েনায় ফিরে আসেন এবং সেখানে বিশেষ পদে নিযুক্ত হন। জীবনের শেষ সময়ে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের জটিলতায় ১৯৬১ সালের ৪ জানুয়ারি এই মহান বিজ্ঞানীর জীবনাবসান ঘটে।




