সদ্য প্রকাশিত ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে জিপিএ-৫ অর্জনের মাধ্যমে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার গুড়িহারী গ্রামের অদম্য মেয়ে মোছা. সাফিয়া খাতুন নতুন করে প্রমাণ করলেন—মেধা ও দৃঢ় ইচ্ছার সামনে দারিদ্র্য কখনোই অপ্রতিরোধ্য হতে পারে না। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশগ্রহণ করে এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জনকারী সাফিয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে এক কঠিন জীবনসংগ্রামের দীর্ঘ কাহিনি।

তার পিতা মো. সাফিউল ইসলাম দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ভিটেমাটি ব্যতীত নিজেদের কোনো জমিজমা নেই তাঁদের। অন্যের কৃষিজমিতে কঠোর পরিশ্রম করে যা উপার্জন হয়, তা দিয়ে কোনোভাবে নুন-ভাতের সংসার চলে। বিদ্যালয়ে অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থার সুবিধা থাকলেও আনুষঙ্গিক খরচ—যেমন খাতা, কলম ও পোশাক—মেটানোই ছিল পরিবারটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকটময় মুহূর্তে এগিয়ে আসেন সাফিয়ার মা মোসা. রওশন আরা। গৃহস্থালির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি হাঁস-মুরগি লালন-পালনের উদ্যোগ নেন। সেই পাখি বিক্রির মাধ্যমে জমানো সামান্য অর্থ দিয়েই কেনা হতো সাফিয়ার শিক্ষাসামগ্রী। মায়ের সেই নিরলস ত্যাগ ও অক্লান্ত পরিশ্রম আজ সাফিয়ার জিপিএ-৫ অর্জনের প্রধান জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় গুড়িহারী শালবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে ২০২১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি গুড়িহারী-কামদেবপুরে অবস্থিত ‘প্রথম আলো ট্রাস্ট’ পরিচালিত ‘আলোর পাঠশালা’য়। প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান। পাঠশালা থেকে নিয়মিতভাবে বিনামূল্যে বই, শিক্ষা উপকরণ ও পোশাক পেয়ে সাফিয়া নিজের মেধার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পান।

সাফিয়া খাতুন বলেন, “আমার মা হাঁস-মুরগি পালন করে আমার পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করেছেন। আলোর পাঠশালা ও শিক্ষকবৃন্দের সহযোগিতা না থাকলে আজকের এই সাফল্য কখনোই সম্ভব হতো না। আমি বড় হয়ে শিক্ষক হতে চাই, যেন আমার মতো দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জীবনের পথ আলোকিত করতে পারি।”

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজিত দাস আবেগে আপ্লুত হয়ে জানান, সাফিয়া অত্যন্ত শান্ত, নম্র ও অত্যন্ত মনোযোগী একজন শিক্ষার্থী। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও তার এই অর্জন প্রমাণ করে—অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম থাকলে যেকোনো প্রতিবন্ধকতাই অতিক্রম করা সম্ভব। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাফিয়া তাদের পুরো বিদ্যালয়ের গর্বের কারণ।

এই সাফল্য কেবল একটি পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেনি; বরং স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, দারিদ্র্য কোনোদিনই মেধার পথ রুদ্ধ করতে পারে না। সঠিক সুযোগ ও সামান্য সহমর্মিতার হাত ধরে সাফিয়ার মতো অবহেলিত প্রতিভাগুলোও একদিন আকাশ ছুঁয়ে যেতে পারে।