রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ তরল মাদক ‘টিএইচসি’সহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম দারাজের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই মাদক বিক্রি করে আসছিলেন বলে জানা গেছে। গ্রেপ্তারকৃত মোহাম্মদ আনিসুর রহমান (৪০) পেশায় একজন কেমিস্ট (রসায়নবিদ)। শুধু তাই নয়, এই মামলায় প্ল্যাটফর্মটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও আসামি করা হয়েছে।

ডিএনসির কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারেন যে, দারাজ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিষিদ্ধ মাদক টিএইচসি কেনাবেচা হচ্ছে। এরপর তারা ক্রেতা সেজে মাদক সংগ্রহ করেন। রাসায়নিক পরীক্ষায় ওই তরল পদার্থে উচ্চমাত্রার ‘টিএইচসি’র উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর ফাঁদ পাতেন তারা। কর্মকর্তারা তিনটি কাচের বোতলে মোট ৬০ মিলিলিটার টিএইচসির ফরমাশ দেন। গত ১৬ আগস্ট বিকেল চারটা পাঁচ মিনিটে রমনার সেগুনবাগিচা তোপখানা রোডের নকশী টাওয়ারের সামনে ওই পার্সেল নিয়ে হাজির হন দারাজের পণ্য সরবরাহকারী কর্মী মো. নাঈম (২০)। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে পার্সেল তল্লাশি করে তিনটি কাচের বোতলে মোট ৬০ মিলিলিটার টিএইচসি উদ্ধার করা হয়।

নাঈম জানান, তিনি বাড্ডার পূর্ব পদরদিয়া আলীনগর সাঁতারকুলের একটি চারতলা ভবনের চতুর্থ তলা থেকে পার্সেলটি সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, ভেতরে মাদক রয়েছে তা তিনি জানতেন না। যেহেতু মাদক কারবারের সঙ্গে নাঈমের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি, তাই তাকে আটক করা হয়নি। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সন্ধ্যা সাতটার দিকে ওই ভবনটি ঘিরে ফেলে ডিএনসির দল। পরে বাড়ির মালিকসহ অন্যদের সাক্ষী রেখে চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে সন্ধ্যা সাতটা পাঁচ মিনিটে চেয়ারে বসা অবস্থায় আনিসুর রহমানকে আটক করা হয়।

আনিসুরের দেওয়া তথ্যে রোববার দুপুর থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত রমনা, বাড্ডা ও রামপুরায় অভিযান চালানো হয়। রাতে রামপুরায় দারাজের হাব কার্যালয়ে গিয়ে হাব সুপারভাইজার মো. সৈয়দ ইরফানকে (৩১) জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি প্ল্যাটফর্মে টিএইচসি থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং জানান, এর বিষয়গুলো দারাজের বনানী প্রধান কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেখাশোনা করেন। পরে জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. বেলাল হোসেনের (৫৩) উপস্থিতিতে পার্সেলসংক্রান্ত দুই পাতার নথিপত্র জব্দ করা হয়।

বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকার ওই চারতলা বাড়ি থেকে ৬২০ মিলিলিটার টিএইচসি উদ্ধার করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা। এছাড়া মাদক প্রস্তুত ও প্যাকেটজাত করার সরঞ্জাম, ৫০টি ছোট কাচের বোতল, দারাজের লোগোসহ পলিথিন প্যাকেট, কম্পিউটার ও মুঠোফোনও উদ্ধার করা হয়েছে। টিএইচসি মূলত গাঁজার ঘনীভূত তরল নির্যাস, যা যন্ত্রের সাহায্যে প্রক্রিয়াজাত করে তেলের মতো তৈরি করা হয় এবং জিবে দিয়ে বা ভেপের (ই-সিগারেট) সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়। আনিসুর দীর্ঘদিন ধরে এই মাদককে ‘সিবিডি তেল’ নামে অনলাইনে বিক্রি করতেন এবং গত পাঁচ বছরে তিনি প্রায় ৪০৫ বোতল টিএইচসি বিক্রি করেছেন বলে জানা গেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আনিসুর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে জাপানে যান। দেশে ফিরে হাতে তৈরি সাবান বানিয়ে বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন, তবে পরে সেই ব্যবসার আড়ালেই মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, ভারত থেকে অবৈধ পথে মাদক আনা হতো। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, দারাজ যাচাই-বাছাই না করেই এ মাদক বিক্রি করে আসছিল এবং অনলাইনে মাদক কেনাবেচা আইনগত অপরাধ। তিনি আরও বলেন, অনলাইনে মাদক কেনাবেচা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দারাজের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ রাইসুল ইসলাম বাপ্পী ও আইন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান জানান, আনিসুর নিজেও মাদকাসক্ত এবং গ্রেপ্তারের পর তার ডোপ টেস্ট করা হয়েছে। সোমবার বাড্ডা থানায় এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।