স্পেনের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত বার্গোস প্রদেশের ছোট্ট একটি গ্রাম আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো—যেখানে বাসিন্দার সংখ্যা মাত্র ১০ জন—সেখানে এক বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছে। চলতি মাসের ১২ আগস্ট আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ অতিক্রম করবে। ১৯৯৯ সালের পর ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে এই প্রথম পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। মাদ্রিদভিত্তিক পদার্থবিদ ড. মারিয়া তেরেসা লোপেজ সানচেজের মতে, ১৯১২ সালের পর স্পেনের মূল ভূখণ্ডে এই প্রথম পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দৃশ্যমান হবে। তবে এই গ্রহণ শুধুমাত্র ইউরোপের একটি সংকীর্ণ পথে দেখা যাবে, এবং আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো সেই পথের ঠিক মাঝে অবস্থিত। গ্রামটির বিশেষত্ব হলো এর খোলা প্রাকৃতিক পরিবেশ। সোনালি গমখেত ও নিচু টিলার বিস্তৃত প্রান্তরের কারণে পশ্চিম দিগন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এখানে ভবন ও কৃত্রিম আলোর পরিমাণ নগণ্য, ফলে দর্শনার্থীর ভিড়ও নেই বললেই চলে। এই সূর্যগ্রহণটি সূর্যাস্তের ঠিক আগে ঘটবে, যার ফলে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুবার গোধূলির আবহ তৈরি হবে। লোপেজ সানচেজ এই অভিজ্ঞতাকে ‘দুটি সূর্যাস্ত’ দেখার মতো বলে বর্ণনা করেছেন। একই রাতে আকাশে দেখা যাবে বিখ্যাত পার্সেইড উল্কাবৃষ্টি—একসঙ্গে দুটি বিরল ঘটনা। স্থানীয় বাসিন্দা সারা আলভারেজ রদ্রিগেজ, যিনি ১৯৩৭ সালে এই গ্রামে জন্মগ্রহণ করে সারাজীবন এখানেই কাটিয়েছেন, তিনি বলেন, ‘গুহার দিকে উঠে যান। সেখান থেকে সবকিছুই দেখা যায়।’ স্মৃতিচারণ করে সারা জানান, ১৯৫০-এর দশকে গ্রামে প্রায় ২০০ মানুষ বাস করত, আর এখন তা কমে ১০-এ দাঁড়িয়েছে। কৃষিকাজ যান্ত্রিক হওয়ায় ও কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ মাদ্রিদ, বিলবাও, বার্সেলোনায় চলে গেছে। বর্তমানে গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দার চেয়ে ছাগলের সংখ্যাই বেশি। তবে এই বিরল ঘটনা দেখতে গ্রামের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পরিবারগুলো ফিরছে। ৭৩ বছর বয়সী রাউল গ্রান্দে রেভিয়া, যিনি এখানে জন্ম নিয়ে ছোটবেলায় মাদ্রিদে চলে যান, তিনি তাঁর সঙ্গী, ছেলে, নাতি-নাতনি ও বন্ধুদের নিয়ে আসবেন। মোট ২০ জনের একটি দল হবে, যা গ্রামের বর্তমান জনসংখ্যার দ্বিগুণ। সারা আলভারেজ জানান, গ্রামের আরও অনেকে বন্ধু ও স্বজনদের আতিথ্য দেবেন। স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ভেনেজুয়েলা থেকেও দর্শনার্থীরা আসছেন। গ্রামের কাছে অবস্থিত প্যারাডর দে লেরমা হোটেলের সব কক্ষ ইতিমধ্যে ভাড়া হয়ে গেছে। কাস্তিয়া ই লেওন অঞ্চলের পর্যটন বোর্ডের কর্মকর্তা আলবের্তো বস্কে কোয়েলো জানান, পুরো অঞ্চলের আবাসন আগে থেকেই বুকড। বিশেষজ্ঞরা ‘সবচেয়ে পরিচিত জায়গা নয়, বরং সবচেয়ে ভালো জায়গা’ খুঁজছিলেন। রাউল গ্রান্দে জানান, ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পরিবার সূর্যগ্রহণ দেখতে স্পেনে আসছে। মাদ্রিদ থেকে যাতে তারা গ্রহণ দেখার সুযোগ না হারান, সে জন্য তিনি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে থাকার ব্যবস্থা খুঁজেছেন। তাঁর বিশ্বাস, এটাই স্পেনের সেরা স্থান। বার্গোস প্রদেশজুড়ে নানা আয়োজন চললেও, আভেইয়ানোসা দে মুয়োনোর গুহাগুলোই সেরা দর্শনস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামবাসী এখান থেকে সূর্যাস্ত দেখেছেন। এমনকি এক সাবেক বাসিন্দার ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর দেহভস্মও এখানে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সারা আলভারেজ কখনো গ্রাম ছেড়ে যাননি, আর রাউল গ্রান্দে প্রতি গ্রীষ্মে ফিরে আসেন। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের দিন আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো আবারও মানুষের কোলাহলে মুখরিত হবে। কিছু মুহূর্তের জন্য, যখন অল্প সময়ের ব্যবধানে দুবার গোধূলি নেমে আসবে, স্পেনের সবচেয়ে উপেক্ষিত এই গ্রামটি বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
এক রাতে দুটি সূর্যাস্ত: স্পেনের ক্ষুদ্র গ্রামে বিরল মহাজাগতিক ঘটনার সাক্ষী হতে প্রস্তুতি
স্পেনের উত্তরাঞ্চলের আভেইয়ানোসা দে মুয়োনো গ্রামে ১২ আগস্ট পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ও পার্সেইড উল্কাবৃষ্টি দেখা যাবে। সূর্যাস্তের ঠিক আগে গ্রহণ হওয়ায় কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুবার গোধূলি নেমে আসবে, যা গ্রামটিকে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।


