পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রে একজন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সরকার পরিচালিত হলেও ব্যতিক্রমী এক শাসনকাঠামো রয়েছে ইউরোপের রাষ্ট্র বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায়। এই একক রাষ্ট্রটিতে একাধিক রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে।

দেশটির শীর্ষে রয়েছেন তিনজন রাষ্ট্রপতি। এই অস্বাভাবিক ব্যবস্থার পশ্চাতে রয়েছে দেশটির করুণ ইতিহাস। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধে বসনিয়াক, সার্ব ও ক্রোয়াট এই তিন প্রধান জাতিগোষ্ঠীর ভয়াবহ সংঘাতে লাখো প্রাণ ঝরে যায় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। রক্তপাত থামাতে ১৯৯৫ সালে স্বাক্ষরিত হয় ডেটন শান্তিচুক্তি। যুদ্ধ-পরবর্তী এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্যই ছিল এমন এক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণ, যাতে কোনো একটি জাতি এককভাবে ক্ষমতা দখল করতে না পারে।

সেই পরিকল্পনা থেকেই জন্ম নেয় তিন সদস্যের যৌথ রাষ্ট্রপতি পরিষদ। তিন প্রধান জাতিগোষ্ঠীর প্রত্যেক থেকে একজন প্রতিনিধি সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। এই তিনজনই সম-মর্যাদাসম্পন্ন এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর তাঁদের মধ্যে থেকে একজনের হাতে বর্তায় প্রেসিডেন্সির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব। ফলে, দেশটি পরিচালিত হয় একক কোনো ব্যক্তির পরিবর্তে সম্মিলিত নেতৃত্বের মাধ্যমে।

তবে শাসনব্যবস্থার জটিলতা এখানেই শেষ হয় না। কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার প্রশাসনিক কাঠামোতে আছে দুটি স্বায়ত্তশাসিত সত্তা, একটি বিশেষ প্রশাসনিক জেলা এবং ১০টি ক্যান্টনের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা। প্রতিটি প্রশাসনিক স্তরের রয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন সরকারপ্রধান। সব মিলিয়ে এই দেশে মোট ১৪ জন ব্যক্তি সরকারপ্রধানের ভূমিকা পালন করেন।

এ ধরনের অভিনব পদ্ধতি নিশ্চিত করে যে, কোনো একক জাতিগোষ্ঠী অন্যদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা হবে। পাশাপাশি, রাষ্ট্র পরিচালনায় সকল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের অধিকারও সংরক্ষিত হয়। কিন্তু এই কাঠামোর প্রতিকূল দিকও রয়েছে। প্রশাসনের বহুস্তরবিশিষ্ট কাঠামো এবং একাধিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারী থাকার ফলে গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কয়েকগুণ সময় লাগে যায়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য প্রায়শই উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্তগুলোকে আটকে দেয়। পৃথিবীর অজানা সব অসাধারণ শাসনব্যবস্থার মধ্যে বসনিয়ার এই মডেল সত্যই একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।