গত মে মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতে তরুণদের নেতৃত্বে যে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আন্দোলনের জন্ম হয়, তা এখন দেশটির রাজনীতির এক উল্লেখযোগ্য সন্ধিক্ষণ। এই আন্দোলনের সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর মাকে নিয়ে কটূক্তি করার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এক ভিডিও বার্তায় মোদি বলেছেন, তিনি তাঁদের 'পথ্রষ্ট সন্তান' হিসেবে দেখেন এবং ক্ষমা করে দিতে চান। গত শুক্রবার রাতে প্রকাশিত ওই বার্তায় তিনি জোর দেন যে, তাদের জন্য শাস্তি নয়, বরং তাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের।
মোদির তৃতীয় মেয়াদে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সঙ্কটের সূত্রপাত হয় যখন গত মাসে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আন্দোলনকারীদের 'তেলাপোকা' অভিহিত করলে বিক্ষোভকারীরা ব্যঙ্গ করে নিজেদের আন্দোলনকের নাম দেন 'ককরোচ'। এ আন্দোলন দ্রুত নয়াদিল্লি ছাড়িয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষা বাতিলের ক্ষোভ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণের দাবিতে রূপ নেয়, এবং শেষত সরকার আন্দোলনকারীদের সব শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন এবং বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করার অঙ্গীকার করা হয়।
তবে প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বাস্তব চিত্র হলো ভিন্ন। বিজেপি শাসিত বেশ কিছু রাজ্যে শত শত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আপত্তিকর উক্তি করেছিলেন। মূলত এ প্রসঙ্গকে ঘিরেই নিজের প্রতিক্রিয়ায় মোদি বলেন, 'আমাদের মেয়েরা কীভাবে এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারে, তা আমাদের সংস্কৃতির জন্য একটি বড় ধাক্কা।...আমি তাদের ক্ষমা করে দিতে চাই।' তাঁর এই বক্তব্যে একজন বিভ্রান্ত অভিভাবকের অবস্থান ফুটে উঠলেও আন্দোলনের মাঠের বাস্তবতা সেটি মোটেই শ্বীকার করে না।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী রাধিকা কুমার আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিযোগ তুলেন, 'রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো দমন–পীড়ন নিয়ে মোদি নীরব। অথচ ইনস্টাগ্রামে এসে নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরছেন।' তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের সমর্থকেরা অনলাইনে নারীদের হেনস্তা করে আসছে এবং এখন প্রধানমন্ত্রী নৈতিকতার দোহাই দিয়েও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে, মোদির সমর্থকদের একটি অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় নারী বিক্ষক, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার মতো নিন্দনীয় ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় শাসকদের কাছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হচ্ছে।
মোদি তাঁর ভিডিও বার্তায় বিক্ষককারীদের 'সন্তান' অভিহিত করলেও, স্মরণ করতে হবে গত মাসে নয়াদিল্লিতে সংসদের দিকে পদযাত্রা করা হয়েছিল এবং সেই সমাবেশকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, ছররার গুলি ও লাঠিচার্জ করে। শিক্ষার্থীদের এই দমন-পীড়নের বিষয়ে মোদি মুখ খুলবেন না তা অনুভব করছে বিরোধী দলও, তারা এই ঘটনার জেরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দায়িত্ব থেকে অপসারণ চাইছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, বিক্ষোভের জের ধরে সরকারি পরীক্ষার পবদ্ধায় আইন সংশোধনে সংসদে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। এতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অপরাধে শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা আছে। অন্যদিকে, কড়া নজরদারি শক্ত করছে প্রশাসন: হায়দ্রাবাদে ফেসবুকে মোদিকে নিয়ে 'আপত্তিকর ও অবমাননাকর' ভিডিও পোস্টের অভিযোগে মেটার ভারত প্রধান অরুণ শ্রীনিবাসের বিরুদ্ধে পুলিশ একটি মামলা দায়ের করেছে। প্ল্যাটফর্মগুলোকে এখন আদালত বা সরকারের নির্দেশে ৩ ঘণ্টার মধ্যে বেআইনি বিষয়বস্তু সরাতে হবে, যা আগে ছিল ৩৬ ঘণ্টা। এই কঠোর টাইমলাইন সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের বাকস্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ কতোটা নিবিড়, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।




