যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার মায়ো ক্লিনিকে ভর্তি তিরাশি বছরের রাহেলা বেগমের মগজ থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে স্মৃতি। সাদা চাদরে গা জড়িয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তাঁর গোল গোল শীতল চোখ অপলক তাকিয়ে আছে। মেয়ে রানু পাশে বসা; মা-মেয়ের মধ্যে চলছে এক নীরব লুকোচুরির খেলা। খিদের কথা বলে ওষুধের সুই খোলার চেষ্টা করা থেকে শুরু করে প্রয়াত ভাইয়ের জন্য উদ্বিগ্ন হওয়া—সময়ের স্রোতে রাহেলা বেগমের স্মৃতির বুনন ভীষণভাবে এলোমেলো হয়ে গেছে।

আব্দুল মুতালিব ছিলেন রাহেলা বেগমের একমাত্র ছোট ভাই, যাকে তিনি সারাজীবন আগলে রেখেছিলেন। বছরখানেক আগে তার মৃত্যু হলেও সেই কঠোর সত্যকে রাহেলা বেগমের স্মৃতি স্বীকার করতে নারাজ। তিনি বারবার মেয়েকে দলকৃতের জন্য টাকা পাঠানোর কথা বলছেন, অথচ তার বড় ছেলে রাহুলের কথা তাঁর মুখে নেই।

রানু জানালেন, কয়েক মাস আগেও মা ছেলের সঙ্গে তোলা পুরোনো ছবি হাতে নিয়ে কাঁদতেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রার্থনা করতেন। কিন্তু গত দুয়েক মাস ধরে ছেলের নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ করছেন না। এই নীরবতায় অভিমান নাকি আলঝেইমারের নিঃশব্দ থাবা, তা নিয়ে ধন্দে ভুগছেন রানু।

রাহেলা বেগমের অসুস্থতার সূত্রপাত একটি দুর্ঘটনার মাধ্যমে। রানুর ছুটির দিনে সুযোগ বুঝে তিনি তুমুল বৃষ্টিতে বাড়ির উঠোনে নেমে যান। নাতনিরা বৃষ্টিতে গোসল করার শখের কথা জানিয়ে নিয়ে গেছে—এই কাল্পনিক গল্প বানিয়ে তিনি দুই হাত মেলে শিশুর মতো খিলখিল করে হেসেছিলেন। সেই আনন্দের পরিণতি ছিল ধূম জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া। মায়ো ক্লিনিকের ডাক্তার থমাস রানুকে জানান, কাল্পনিক গল্প তৈরি করা আলঝেইমার্সের খুবই সাধারণ একটি লক্ষণ।

হাসপাতালে কয়েক ঘণ্টা পরপর নার্সরা এসে শিরায় তরল ওষুধ দিচ্ছেন, যা রাহেলা বেগমের একেবারেই পছন্দ নয়। সুযোগ পেলেই তিনি আইভি লাইনটি টেনে খুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। গতকাল এমন এক কাণ্ডে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়েছিল এবং শ্বেতাঙ্গ নার্স এসে হুলুস্থুল বাধিয়ে নতুন করে সুই ফোটাতে বাধ্য হন।

প্রবাসী মেয়ে রানু সপ্তাহে পাঁচ দিন চাকরি করেন, জামাতা রায়ানের ডিউটি ছয় দিন। তাই মায়ের দেখভালের জন্য একজন 'হোম এইড' রাখা হয়েছে। সেই ভদ্রমহিলাও রাহেলা বেগমের অদ্ভুত আচরণের শিকার হয়েছেন। তসবি খুঁজে না পেয়ে তাকে চোর সাব্যস্ত করায় একদিন অমায়িক সহকারীটি কেঁদে ফেলেন। অথচ পরে জিজ্ঞেস করলে রাহেলা বেগম বিস্ময়াভিভূত হয়ে পুরো ঘটনাই অস্বীকার করেছেন।

একসময়ের অত্যন্ত গোছানো ও পরিপাটি সাংসারিক মানুষটি এখন রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, মনে করতে পারেন না নিজের শোবার ঘর কোনটি। গভীর রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের গান গুনগুন করেন অথবা নীরবে চাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

হাসপাতালে নয় দিন কাটানোর পর এক গোধূলি লগ্নে জানালার পাশে বসা রাহেলা বেগম কাঁপা কাঁপা গলায় মেয়ের হাত ধরে শেষ ইচ্ছের কথা বলেন। তিনি রানুকে দায়িত্ব দেন তার মৃত ভাই আব্দুল মুতালিবকে দেখার। ছেলেবেলার বঞ্চনার স্মৃতিচারণ করে তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন, যে তারা বড় হয়েছেন লাথি-উষ্ঠা খেয়ে। অথচ সেই মুহূর্তে নিজের গর্ভে ধরা জীবিত ছেলের কোনো অস্তিত্বই তার মগজের কোনো কোনায় উঁকি দেয় না। মৃত্যুপথে স্বজনকে অর্পিত এই শেষ দাবির ভার রানুর বুকটাকে মুচড়ে দেয়। মিনিয়াপোলিসের বুকে নেমে আসা অন্ধকারে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে এক মায়ের ক্ষয়িষ্ণু স্মৃতির শেষ কণাটুকু, কিন্তু থেকে যায় এক অমোঘ স্নেহের মায়া, যা মৃত্যু বা বিস্মৃতি কোনোকিছুতেই মুছে ফেলা সম্ভব নয়।