সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোকপাত করেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েলবিয়িং রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট। ২০২৬ সালের এই প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বিশেষত অ্যালগরিদমের ওপর ভিত্তি করে চলা কিছু প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের জীবনে সন্তুষ্টির মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকের মতো যেসব মাধ্যম মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে অগ্রাধিকার দেয়, সেগুলো ব্যবহারকারীদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর বিপরীতে ইনস্টাগ্রাম, টিকটক এবং এক্স (সাবেক টুইটার)-এর মতো প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ সময় কাটালে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং জীবন সম্পর্কে অসন্তুষ্টির ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
গবেষকরা এই পার্থক্যের মূল কারণ হিসেবে প্ল্যাটফর্মগুলোর নকশাকে দায়ী করেছেন। হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকে ব্যক্তিরা সাধারণত পরিচিতজনদের সাথে বার্তা বিনিময় ও পরিবারের খোঁজখবর নেন। কিন্তু ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে ব্যবহারকারীরা মূলত অ্যালঅরিদমের পছন্দ করা ভিডিও ও ছবির দীর্ঘ ধারায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। সেখানে ইনফ্লুয়েন্সারদের সুসজ্জিত জীবন, নিখুঁত মুহূর্তের ছবি এবং আকর্ষণীয় কনটেন্টের প্রাচুর্য অনেককেই অজান্তে অপরের সাথে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করতে প্ররোচিত করে।
তবে গবেষণায় একটি আশ্চর্য তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। দেখা গেছে, যাঁরা প্রতিদিন এক ঘণ্টা বা তারও কম সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন, তাঁরা একেবারেই ব্যবহার পরিত্যাগ করা ব্যক্তিদের তুলনায় জীবনের কিছু ক্ষেত্রে অধিক সন্তুষ্টি অনুভব করেন। কিন্তু যখন এই ব্যবহার বেড়ে গিয়ে প্রতিদিন গড়ে আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছায়— যা অংশগ্রহণকারীদের সাধারণ পরিসংখ্যান— তখনই নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়।
ওয়েলবিয়ং রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ইয়ান-ইমানুয়েল ডে নেভের মন্তব্যে এই প্রক্রিয়াকে ‘গোল্ডিলকস নীতি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, একেবারেই ব্যবহার না করা বা অতি ব্যবহারের পরিবর্তে একটি মধ্যমপন্থী অবস্থানই সবচেয়ে উপকারী হতে পারে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেই সবকিছুর জন্য দায়ী করলে সমস্যাটির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। যেসব দেশে তরুণদের মাঝে সুখের স্তর নিচের দিকে, সেখানে যোগাযোগমাধ্যমের বাইরেও বহু কারণ বিদ্যমান। জীবনযাপনের ক্রমবর্ধমান খরচ, পেশাগত অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা এবং অর্থনৈতিক চাপের মতো বাস্তব কারণগুলোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিষয়টির সমাধানে বিশেষজ্ঞরা পুরোপুরি প্ল্যাটফর্ম ত্যাগের প্রয়োজন মনে করেন না। বরং ব্যবহারের কৌশলই মুখ্য। তাঁদের পরামর্শ হলো, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানোর বদলে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে চলা; বাস্তব জীবনের বন্ধু ও আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া; ঘুমাতে যাওয়ার আগে দীর্ঘ সময় এসব মাধ্যম এড়িয়ে চলা; এবং অন্যের প্রদর্শিত জীবনকে নিজের বাস্তবতার মাপকাঠি না বানানোর চেষ্টা করা। এছাড়া স্মার্টফোনের 'স্ক্রিন টাইম' বা 'ডিজিটাল ওয়েলবিং' ফিচার কাজে লাগিয়ে ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করাও সহায়ক হতে পারে।
মূল বক্তব্য হলো, সামাজিক মাধ্যম নিজে থেকেই ভালো বা খারাপ নয়; এটি ব্যবহারকারীর ব্যবহার পদ্ধতির ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। যে মাধ্যম মানুষকে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বাঁধনে ধরে রাখতে পারে, সেটি সুফল বয়ে আনতে পারে। পক্ষান্তরে, যদি কেউ অ্যালগোরিদমের স্ক্রলিংয়ের চক্রে দীর্ঘসময় হারিয়ে যান, তাহলে সেটিই ক্রমে ক্রমে তার মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নিতে পারে।



