গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ ও ৩-এ বন্দীদের জীবন এখন শুধু সাজাভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সেখানে তারা বিভিন্ন কাজে নিজেদের দক্ষ করে তুলছেন এবং আয়ও করছেন। কারাগারের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে পোশাক, সাবান, আসবাবপত্রসহ নানা ধরনের পণ্য, যা 'কারা পণ্য' নামে ব্র্যান্ডিং করে বিক্রি করা হচ্ছে। বিক্রি থেকে পাওয়া লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট বন্দীদের দেওয়া হয়।

সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুন জানান, শুধু কর্মরতদের পোশাকই নয়, সশ্রম কয়েদিদের জন্য নির্ধারিত মোটা সাদাটে কাপড়ের সুতা তৈরি থেকে শুরু করে পুরো পোশাকটিই বন্দীদের হাতে তৈরি। এমনকি সুগন্ধি ও কাপড় ধোয়ার সাবান এবং রাতে ব্যবহারের কম্বলও অত্যাধুনিক মেশিনে তারা নিজেরাই পরিষ্কার করেন।

গত ১৪ জুলাই কারা মহাপরিদর্শকের বিশেষ অনুমতিতে এই দুই কারাগার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়। মহিলা কারাগার-৩-এ মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বন্দীরা নকশিকাঁথা সেলাই করছিলেন। একজন নারী ২০ থেকে ২৫ দিনে একটি কাঁথা সেলাই করেন। কাজের মজুরি 'প্রিজনার ক্যাশ' কার্ডে জমা হয়, যা দিয়ে ক্যানটিন থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যায় বা পরিবারের কাছে পাঠানো যায়।

কারাগারের বিউটি পার্লারেও কাজ করছেন বন্দীরা। কেউ স্পা করছেন, কেউ চুল কাটছেন। ৩৫ ধরনের সেবার মূল্য তালিকা টাঙানো আছে সেখানে। রূপবিশেষজ্ঞ হিসেবে যারা কাজ করছেন, তাদের কেউ কেউ কারাগারে আসার আগে এই পেশায় ছিলেন এবং এখন অন্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

পোশাক তৈরির কক্ষে থ্রিপিসের মজুরি ২৫০ টাকা, ওয়ানপিস ১৪০ টাকা, সাধারণ ব্লাউজ ১৫০ টাকা — সব মূল্য তালিকা দেয়া আছে। তবে ব্লক-বাটিকের প্রশিক্ষণ আপাতত বন্ধ থাকলেও ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আগে তা আবার চালু হবে বলে জানা গেছে।

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর কারাবন্দী পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ স্কুলে প্রশিক্ষণার্থীদের দম ফেলার ফুরসত নেই। আধুনিক আসবাবপত্র, এমব্রয়ডারি, মোজা, গার্মেন্টস, প্রিন্টিং প্রেস, বুক বাইন্ডিং, ইলেকট্রনিকস, মোড়া ও ওয়েল্ডিং, পাওয়ার লুম, দরজিসহ বিভিন্ন ট্রেডে কাজ করছেন তারা। বেতের আসবাবপত্র তৈরির কক্ষে জিআইজেড, ঢাকা আহছানিয়া মিশন, ইউকে এইড, জার্মান কো-অপারেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় প্রশিক্ষণ চলছে।

৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত সাবেক বিডিআর সদস্য জাহাঙ্গীর আলম ২০১৫ সাল থেকে এই কারাগারে আছেন। তিনি জানান, কাজের ফলে শরীর ও মন ভালো থাকে এবং মজুরি পাওয়া যায়। জেল কোডের বিধান অনুযায়ী শারীরিক শ্রমে যুক্ত থাকায় সাজা কমানোর সুবিধাও মিলছে।

৬ জুলাই উদ্বোধন হওয়া সাবান ফ্যাক্টরিতে অত্যাধুনিক মেশিনে তৈরি হচ্ছে 'প্রিজন ফ্রেশ সোপ'। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিফটে ৩০ জন বন্দী দিনে ১৬ থেকে ২০ হাজার সাবান তৈরি করছেন। প্রথমে এই কারাগারের চাহিদা মেটানো হবে, পরে অন্যান্য কারাগারে সরবরাহ ও বাইরে বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া কারা বেকারিতে পাউরুটি, বিস্কুটসহ নানা খাবারও তৈরি হচ্ছে।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৭৩টি কারাগারে বন্দীদের তৈরি পণ্য ৫ কোটি ৬৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ সময়ে ৮ লাখ ১৩ হাজার ৮৮৮ জন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া বন্দীরা পারিশ্রমিক হিসেবে পেয়েছেন ৩ কোটি ৮১ লাখ ৪২ হাজার টাকা। তবে ৩৮টি কারাগারে যুগোপযোগী ৩৯টি ট্রেডে ব্যাপক আকারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সবাইকে এই সুযোগ দেওয়া যাচ্ছে না, যা বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন কারাগারে বন্দীরা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, মোবাইল সার্ভিসিংয়ের মতো আধুনিক প্রশিক্ষণও পাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে পূর্ণাঙ্গ গার্মেন্টস কারখানাই গড়ে তোলা হয়েছে। চলতি বছর ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় জেনারেল প্যাভিলিয়ন ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে প্রথম পুরস্কার পেয়েছে কারা অধিদপ্তর।

গত বছরের ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বন্দীদের মধ্যে আবারও অপরাধ করার প্রবণতা ২০২০ সালে বেড়ে ৫২ শতাংশে দাঁড়ায়। পুনর্বাসন কর্মসূচি এই প্রবণতা রোধে সহায়ক। গবেষণায় আরও বলা হয়, অতিরিক্ত বন্দীর চাপে ঘুমানোর জায়গা কমে ১৫ বর্গফুটে দাঁড়িয়েছে। মুক্তির পর কর্মসংস্থান ও বাসস্থানে বন্দীরা তীব্র সামাজিক কলঙ্কের শিকার হন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, বন্দী ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। বাংলাদেশ জেলের নাম পরিবর্তন করে কারেকশন সার্ভিসেস বাংলাদেশ করার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বিজিএমইএর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বন্দীদের সনদ দেওয়া এবং তাদের চাকরিতে সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।