দেশীয় ফ্যাশন উদ্যোগ সরলা এবার অনলাইনের বাইরে নিজস্ব অফলাইন শোরুমে পা রাখল। রাজধানীর কালাচাঁদপুর নর্দায় গত ৩১ জুলাই ব্র্যান্ডটির প্রথম ফিজিক্যাল স্টোরের উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন সরলার ক্রেতা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও কাছের মানুষজন।
একটি ডাইনিং টেবিল থেকে শুরু হয়েছিল সরলার পথচলা। উদ্যোক্তা মানসুরা ইয়াসমিন স্পৃহা স্বপ্ন দেখেছিলেন, পাশে ছিলেন তাঁর জীবনসঙ্গী আমিনুল্লাহ বাবু। তাদের প্রচেষ্টায় সেটি এগারো বছরে একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম চালানোর পর অনেক ক্রেতা সরাসরি পোশাক দেখে কেনার আগ্রহ প্রকাশ করায় প্রায় ৬০০ বর্গফুটের একটি স্টোর চালুর সিদ্ধান্ত নেয় সরলা। কে-৩৪/২, কালাচাঁদপুর স্কুল রোডের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত এই আউটলেটে ক্রেতারা কাপড়ের মান, নকশা ও ফিনিশিং নিজের চোখে দেখে কেনাকাটা করতে পারবেন।
নতুন স্টোরটিতে সরলার নিজস্বতার ছাপ স্পষ্ট। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেয়ালজুড়ে আঁকা একটি চিত্রগল্প নজর কাড়ে, যা শুধু সাজসজ্জার অংশ নয়—বরং সরলার জন্ম থেকে বর্তমান পর্যন্ত যাত্রার শিল্পিত উপস্থাপনা। উদ্যোক্তাদের ডাইনিং টেবিলে বসে স্বপ্ন দেখা, কারিগরদের সঙ্গে কাজ শুরু, একটি টিম গঠন এবং শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের গল্প ফুটে উঠেছে দেয়ালচিত্রে।
আউটলেটের সামনের অংশে সরলার সিগনেচার হ্যান্ডপেইন্টেড সানগ্লাস সংগ্রহ রাখা হয়েছে। এর পরেই বড় জায়গা দখল করে আছে সরলার ফ্লেক্সি ব্লাউজ, যা নকশা ও ফেব্রিকের বৈচিত্র্যের জন্য বেশ জনপ্রিয়। রয়েছে আরামদায়ক শার্ট ও কুর্তির ডিসপ্লে। এক পাশে ব্লক ও তাঁতের শাড়ি, পাশাপাশি সিগনেচার ইলাস্ট্রেটেড শাড়িও রয়েছে। নতুন কালেকশনে এসবই সবার নজর কেড়েছে।
শুধু পোশাক নয়, সরলা এনেছে নিজস্ব নকশার ব্রাসের গয়নাও—কানের দুল, নেকপিস ও নথ। আছে কাঁচের চুড়ি ও টিপের সংগ্রহ, এমনকি পেটিকোটও। ফলে ক্রেতারা এক জায়গায় পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে সাজের অনুষঙ্গ বেছে নিতে পারবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মানসুরা ইয়াসমিন স্পৃহা বলেন, ‘২০১৬ থেকে ২০২৬—অনলাইন থেকে সরলাকে নিজের একটা জায়গা দিতে অনেক সময় লেগেছে। আমি সবসময় ধীরে এগোতে চেয়েছি, যেন ভিত্তিটা শক্ত হয়। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, সরলার জন্য নিজের একটি জায়গা করতে পেরেছি।’
স্পৃহার দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ও সমর্থক আমিনুল্লাহ বাবু বলেন, ‘আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি, স্পৃহা চাইলে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারবে। সে সেটা করে দেখিয়েছে। তবে এখানেই শেষ নয়। সরলা এখনো যাত্রাপথের মাঝামাঝি অবস্থানে আছে। সামনে সে আরও অনেক দূর যাবে।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হাল ফ্যাশনের কনসালটেন্ট ও জ্যেষ্ঠ ফ্যাশন সাংবাদিক শেখ সাইফুর রহমান, ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ চ্যাম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রাক্তন সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল, ফ্যাশন এন্টারপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি আজহারুল হক আজাদ, রঙ বাংলাদেশের কর্ণধার সৌমিক দাশ, হাল ফ্যাশনের সিনিয়র কন্টেন্ট ক্রিয়েটরসহ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির আরও অনেকে। সহ–উদ্যোক্তারাও শুভেচ্ছা জানাতে আসেন।
আজহারুল হক আজাদ বলেন, ‘নতুন আউটলেটে ব্র্যান্ডটির নিজস্ব পরিচয় ও দর্শনের উপস্থিতি স্পষ্ট। অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমকে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা যেভাবে ব্যবসা এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তা প্রশংসনীয়।’ শেখ সাইফুর রহমানের মতে, সরলার নতুন ঠিকানা ‘সুইট অ্যান্ড সিম্পল’। তাঁর ভাষায়, ব্র্যান্ডটির নামের মতো উপস্থাপনাও সরল, পরিমিত ও আকর্ষণীয়। শাহেদুল ইসলাম হেলাল আউটলেটজুড়ে দেশীয় পণ্যের উপস্থিতিতে মুগ্ধ হয়ে বলেন, দেশের ফ্যাশন শিল্পকে শক্তিশালী করতে এমন উদ্যোগের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। সৌমিক দাশ বলেন, ‘ছোট উদ্যোগগুলো পরিশ্রমের মাধ্যমে বড় হতে দেখে ভালো লাগে। সরলা অনলাইনে ধারাবাহিকভাবে ভালো কাজ করছে। নতুন আউটলেট সেই সফলতারই স্বাক্ষর। সামনে সরলা আরও বড় হোক—এই শুভকামনা রইল।’
এক দশকের বেশি অনলাইন অভিজ্ঞতার পর সরলার জন্য এই আউটলেট শুধু নতুন বিক্রয়কেন্দ্র নয়, বরং দীর্ঘ পথচলার আরেকটি মাইলফলক। ক্রেতাদের কাছাকাছি পৌঁছানোর পাশাপাশি দেশীয় ফ্যাশনের প্রতি সরলার বিশ্বাস ও যাত্রাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে এই ঠিকানা।


