ইতিহাসের পাতায় জাহেলি যুগকে প্রায়শই অন্ধকার ও বর্বরতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে সেই অন্ধকারের ভেতরেও আরবদের মধ্যে কিছু উচ্চমানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বিদ্যমান ছিল, যা পরবর্তীকালে ইসলাম পরিমার্জিত ও পূর্ণতা দান করে। মহানবী (সা.) নিজের আগমনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি সচ্চরিত্রকে পূর্ণতা দিতে প্রেরিত হয়েছেন (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৮৯৫২)। শত্রুতার মধ্যেও যেসব মানবিক গুণাবলী রক্ষিত হয়েছিল, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মেলে হিজরতের পূর্ববর্তী সংকটময় দিনগুলোতে।
মক্কায় মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া তিন বছরের নির্মম বয়কট ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়। শিআবে আবি তালিবের গিরিসংকটে অবরুদ্ধ মুসলিমদের পাশাপাশি হাশিম ও মুত্তালিব বংশের সদস্যরাও চরম খাদ্যসংকটে পড়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে হিশাম ইবনে আমর নামে এক ব্যক্তি, যিনি হাশিম বংশের আত্মীয় ছিলেন, রাতের অন্ধকারে উটের পিঠে খাদ্য ও বস্ত্র বোঝাই করে উপত্যকার মুখে ফেলে যেতেন। অবরুদ্ধ মানুষেরা সেসব সংগ্রহ করে জীবনধারণ করত। শুধু তাই নয়, তিনি জুহাইর ইবনে আবু উমাইয়া, মুতইম ইবনে আদি, আবু আল-বাখতারি ও জামআ ইবনে আল-আসওয়াদকে একত্রিত করে কাবার প্রাঙ্গণে গিয়ে কোরাইশ নেতাদের সামনে প্রতিবাদ জানান। জুহাইর সেদিন চিৎকার করে বলেন, তারা নিজেরা পেটপুরে খায়, অথচ বনু হাশিম অনাহারে মারা যাচ্ছে—যতক্ষণ না সেই অন্যায় চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলা হবে, তিনি বসবেন না। আবু জাহেল বাধা দিতে চাইলেও এই পাঁচজনের ঐক্যের জোরেই বয়কট বাতিল হয়। এরা কেউই তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি; শুধু সামাজিক ন্যায়বিচারের তাগিদেই এগিয়ে এসেছিলেন।
শত্রুতার মাঝেও রক্তের সম্পর্কের প্রতি সম্মানের আরেক অনন্য নিদর্শন দেখা যায় আবিসিনিয়ায় হিজরতের ঘটনায়। কোরাইশরা মুসলিমদের ফিরিয়ে আনতে আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবিয়াকে প্রতিনিধি পাঠায়। প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে আমর বাদশাহ নাজাশির কাছে মিথ্যা তথ্য দিতে চাইলেন যে মুসলিমরা নবী ঈসাকে আল্লাহর বান্দা মনে করে না। তখন আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবিয়া তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, যদিও তারা মতের বিরোধিতা করেছে, তবুও তারা আত্মীয় এবং তাদের রক্তের অধিকার রয়েছে (বাইহাকি, দালানুল নবুওয়াহ, ২/৩০০)। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রক্তের সম্পর্ক ও মানবিক মর্যাদা লঙ্ঘন না করার এই আত্মসংযম তৎকালীন আরবের নৈতিক উচ্চতার পরিচয় বহন করে।
নারীর গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি জাহেলি সমাজে কতটা গুরুত্ব পেত, তার প্রমাণ মেলে নবীজিকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনার সময়। মক্কার বিভিন্ন গোত্রের যুবকরা রাতে তাঁর ঘর ঘিরে ফেললেও ভেতর থেকে কোনো নারীর কণ্ঠস্বর শুনে তারা থমকে দাঁড়ায়। তারা নিজেদের মধ্যে বলে, যদি ইতিহাসে লেখা যায় যে তারা রাতের আঁধারে দেয়াল টপকে ঘরের মেয়েদের পর্দা নষ্ট করেছে, তবে তা আরব সমাজে চিরস্থায়ী কলঙ্ক হয়ে থাকবে (আস-সুহাইলি, আর-রাওদুল উনুফ, ৪/৪১)। শত্রুতা চরমে থাকা সত্ত্বেও নারীর মর্যাদা ও ঘরের গোপনীয়তা রক্ষার এই দৃষ্টান্ত উল্লেখযোগ্য।
হিজরতের পথে উম্মে সালামা (রা.)-এর সঙ্গী হয়েছিলেন ওসমান ইবনে তালহা, যিনি তখনো অমুসলিম ছিলেন। উম্মে সালামা একা শিশুসন্তান নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলে ওসমান তাঁকে দেখে জিজ্ঞাসা করেন কোথায় যাচ্ছেন। একা যাত্রার কথা জানার পর তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর কসম, তাঁকে একা ছেড়ে দেওয়া যায় না। তিনি পদব্রজে উটের লাগাম ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন। উম্মে সালামা (রা.) তাঁর প্রশংসায় বলেছিলেন, আরবদের মধ্যে ওসমান ইবনে তালহার চেয়ে সম্মানিত ও সচ্চরিত্র পুরুষ তিনি দেখেননি। যাত্রাবিরতির সময় তিনি উট বসিয়ে দূরে সরে যেতেন, উম্মে সালামা নামার পর উট বেঁধে অন্য গাছের নিচে শুয়ে থাকতেন। আবার যাত্রা শুরুর সময় উট প্রস্তুত করে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। পুরো পথে তিনি একবারও উম্মে সালামার দিকে দৃষ্টিপাত করেননি (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৪৬৯)।
হিজরতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে পথপ্রদর্শক নির্বাচন ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কোরাইশরা নবীজিকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে ১০০ উটের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিত, যিনি তখনো কোরাইশি ধর্মে বিশ্বাসী, তিনি চুক্তি অনুযায়ী তিন দিন পর সাওর পর্বতের গুহায় এসে নবীজি ও আবু বকর (রা.)-এর উট নিয়ে উপস্থিত হন। তিনি চাইলে সহজেই কোরাইশদের কাছে গোপন আস্তানার খবর দিয়ে ধনকুবের হতে পারতেন, কিন্তু তিনি বিশ্বস্ততা বজায় রেখে নিরাপদে তাঁদের মদিনায় পৌঁছে দেন (ইবনে হিব্বান, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃ. ১৩৫)। কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন ন্যায়বিচার ত্যাগ করতে প্ররোচিত না করে (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৮)—এই শিক্ষাই যেন প্রতিটি ঘটনায় প্রতিফলিত হয়।




