পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক বান্দাকে ভালোবাসার কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে একজন বান্দা প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টিকর্তার এই প্রীতি লাভ করতে পেরেছেন কি না, তা যাচাই করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিদর্শন রয়েছে। একজন ইসলামী শিক্ষক সম্প্রতি এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা একজন মুমিনের জীবনে প্রকাশ পেলে ধরে নেওয়া যায় যে তিনি পরম করুণাময়ের প্রিয়পাত্র হয়েছেন।

প্রথম যে লক্ষণটি উল্লেখ করা হয় তা হল দুনিয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থার সৃষ্টি হওয়া। সুরা মারইয়ামের ৯৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যেসব ব্যক্তি ঈমান এনেছেন ও নেক আমল করেছেন, তাদের জন্য আল্লাহ ভালোবাসা নির্ধারণ করে দেবেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আব্দুর রহমান সাদি (রহ.) ব্যক্ত করেছেন, ঈমান ও সৎকর্মের সমন্বয় যার জীবনে ঘটে, আল্লাহ তাআলা আসমান ও জমিনের বাসিন্দার অন্তরে তার প্রতি দরদ ও টান সৃষ্টি করে দেন। ফলে সমাজে তার মর্যাদা বাড়ে। বিষয়টি একটি হাদিসেও পরিস্ফুট হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে বান্দা নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর তুষ্টি অর্জনে মগ্ন হলে তিনি জিবরাইল (আ.)-কে ডেকে সেই বান্দার প্রতি সন্তুষ্টির কথা জানান, অতঃপর জমিন ও আসমানবাসির মাঝে তার প্রতি রহমত ও কবুলিয়ত ছড়িয়ে দেওয়া হয়। (মুসনাদে আহমাদ, ২২৪০১)

দ্বিতীয় আলামত হল জাগতিক ফেতনা-ফেসাদ এবং অনিয়ন্ত্রিত ভোগ-বিলাস থেকে নিজ গুণে মুক্ত থাকা। রাসূল (সা.) একটি হাদিসে এরূপ ব্যক্তির উদাহরণ দিয়েছেন যে আল্লাহ যখন কোনো বান্দার মঙ্গল চান, তখন তাকে দুনিয়ার মোহ থেকে সেভাবে দূরে সরিয়ে রাখেন, যেমনভাবে তোমরা রোগীকে পানি থেকে বিরত রাখো। ধর্মীয় বিশ্লেষক ও শিক্ষক মাহমুদ হাসান ফাহিম উদ্ধৃতি দেন যে, আবু হাজেম সালামা ইবনে দিনার (রা.) দুনিয়াবি আরাম-আয়েশ থেকে বিচ্যুত থাকাকে একটি বড় নেয়ামত বলতেন, কেননা প্রাচুর্য পেয়েই বহু জাতি ধ্বংসের পথে অগ্রসর হয়েছিল। দুনিয়ার লোভে অন্ধ ব্যক্তি কখনোই জ্ঞান বা ইবাদতের কঠিন পথে সাধনায় স্থির থাকতে সক্ষম নয়। ফলে যাকে কল্যাণে ভরিয়ে দিতে চান, আল্লাহ তাকে অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা থেকে সংরক্ষণ করেন।

তৃতীয় ও শেষ লক্ষণটি হলো, জীবনে নানামুখী পরীক্ষা ও বিপদাপদের সম্মুখীন হওয়া। এ সংক্রান্ত একটি বাণীতে মহানবী (সা.) ব্যক্ত করেছেন, মুসিবতের আকার যত বৃহৎ হবে, তার পুরস্কারও তত সুমহান হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের নানা পরীক্ষার মুখোমুখি করেন। এরপর যে এই পরীক্ষায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে, আল্লাহও তার প্রতি সন্তুষ্ট হন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, ৪০৩১) অন্য আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন পৃথিবীতেই তার ওপর বিপদ-আপদ দ্রুত আপতিত করেন, যাতে পরকালে সে পাপমুক্ত হয়ে যেতে পারে। তিরমিজি শরিফের এই বর্ণনার আলোকে বোঝা যায় যে, বিপদে ধৈর্যহারা না হয়ে পরমতায় সন্তুষ্ট থাকাই প্রকৃত মুমিনের লক্ষণ। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই কোনো ব্যক্তির জীবনে যুগপৎ বিদ্যমান থাকলে তাকে আল্লাহর প্রিয়ভাজন বলে উপলব্ধি করা যেতে পারে।