ইসলামে স্বেচ্ছাসেবী মানসিকতা ও পরোপকারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কল্যাণমুখী জীবনর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এ ধর্মে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে ইবাদতের সর্বোচ্চ স্তরের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সৎকর্ম ও পরোপকারের মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতার পথে চলতে হবে এবং পাপ ও সীমালংঘনের ক্ষেত্রে কোনো সহযোগিতা করা যাবে না (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)। একজন মুমিনের কাছে এই শিক্ষা নিছক উপদেশ নয়, বরং একটি ইমানি অঙ্গীকার।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সৃষ্টির খেদমতকে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পন্থা হিসেবে চিহ্নিত করে গেছেন। একটি হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন, কেন তিনি অসুস্থ থাকার পরও বান্দা তার পরিচর্যা করেনি। বান্দার সন্দেহপ্রকাশের জবাবে আল্লাহ বলবেন যে, অমুক অসুস্থ বান্দার সেবা করলেই বান্দা তাকে আল্লাহর কাছেই পেতে পারত (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৯)। এই দর্শনটি মানুষকে পার্থিব কোনো প্রতিদান বা পরিচিতির আকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে সাহায্য করে।
ইসলামী কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক রূপগুলোতেও এই স্বেচ্ছাসেবী চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে। জাকাত, সদকা, ফিতরা ও ওয়াকফের মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলো সমাজের বঞ্চিত ও অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য সম্পদশালীদের সম্পদ থেকে একটি নির্ধারিত অংশ নিশ্চিত করে। এই বণ্টনরীতি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বেচ্ছাসেবার মডেলই তৈরি করে, যা সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।
হাদিস শরীফে আরও বলা হয়েছে, যেই ব্যক্তি অপরের জন্য বেশি উপকারী, তিনিই আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় (মুজামে কাবির, তাবারানি, হাদিস: ৬২২৯)। নবীজি (সা.) আরও শিক্ষা দিয়েছেন যে, মানুষের প্রতিটি ভালো কাজই এক প্রকারের দান (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২১)। এমনকি কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে সহায়তা করা, পথভ্রষ্ট কাউকে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া অথবা কারও কষ্ট লাঘব করার মতো আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ কাজগুলোও ইসলামে ‘সদকা’ হিসেবে বিবেচিত।
আধুনিক সমাজে সেবামূলক কাজ অনেক সময় আত্মপ্রচার ও ভাবমূর্তি গঠনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। ইসলামী নীতি এই প্রবণতাকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয় এবং গোপন দান ও নিঃস্বার্থ সেবাকে বিশেষ মর্যাদা দান করে। নবীজির (সা.) জীবনই হলো এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মসজিদে নববি নির্মাণের সময় তিনি নিজের কাঁধে ইট বহন করেছিলেন এবং দুর্ভিক্ষের মূহুর্তে ক্ষুধার্তদের মধ্যে নিজের খাবার বিলিয়ে দিতেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের ভাইয়ের প্রয়োজন মিটায়, আল্লাহ তার প্রয়োজন মেটান; আর যে কোনো মুসলিমের দুঃখ-কষ্ট দূর করে, আল্লাহ তার কিয়ামতের দিনের কষ্টগুলো দূর করে দেবেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪২)।
বর্তমানের দুর্যোগ, দারিদ্র্য ও মানবিক সংকট মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ও সচেতন স্বেচ্ছাসেবী সমাজ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ইসলাম শিক্ষা দেয়, একটি পিঁপড়ারও সহায়তা করা বা একটি পিপাসিত প্রাণীকে পানি পান করানোর মধ্যেও অপার সওয়াব নিহিত। যখন কোনো ব্যক্তি বিশ্বাস করবে যে তার শ্রম, মেধা ও সম্পদ কেবলমাত্র নিজের জন্য নয়, বরং তা সমাজেরই জন্য উৎসর্গিত, তখনই সমাজ থেকে সহিংসতা ও বঞ্চনা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করাকেই ইসলাম প্রকৃত মনুষ্যত্ব হিসেবে চিহ্নিত করে। একটি সুন্দর ও আদর্শ সমাজ তৈরিতে পরোপকারের মনোভাবের কোনো বিকল্প নেই। আজকের অস্থির বিশ্বে শান্তি ও মানবিকতা পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজতে গেলে নবীজির (সা) দেখানো সেই সেবামুখী আদর্শকে আবার জীবনে ধারণ করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। সত্যিকারের মুমিন হলো সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মানুষ নিরাপদে থাকে এবং যার সমগ্র উপস্থিতি গোটা সমাজের জন্য রহমতে পরিণত হয়।




